দেবেন্দ্র কে. ঢুঙ্গানা
জাতীয় বিভূতি তথা যুবকবি মোতিরাম ভট্টের ১৬১তম জন্মজয়ন্তী উদযাপন করতে গিয়ে নেপালি সাহিত্যের গৌরবময় ইতিহাস স্মরণ করার পাশাপাশি বর্তমান পরিস্থিতির নির্মম পর্যালোচনা করার সময় এসেছে। জন্মজয়ন্তী, স্মরণ দিবস এবং সাহিত্যিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু এসব আয়োজন যদি কেবল আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান, বক্তৃতা, মাল্যদান ও সম্মাননার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তা মোতিরাম ভট্টের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা হতে পারে না। আজ প্রয়োজন শুধু মোতিরামকে স্মরণ করা নয়; বরং তিনি নেপালি সাহিত্যে যে সৃজনশীলতা, অনুসন্ধান, প্রকাশনা-সংস্কার এবং সাহিত্যিক সততা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন, তা বাস্তবে প্রয়োগ করা।
বি. সং. ১৯২৩ সালের ভাদ্র কৃষ্ণ অমাবস্যায় জন্মগ্রহণকারী মোতিরাম ভট্ট অল্পায়ুতেই নেপালি সাহিত্যের বিকাশে অসাধারণ অবদান রেখেছিলেন। আদিকবি ভানুভক্ত আচার্যের জীবনী প্রকাশ করে তিনি নেপালি সমাজকে তার নিজস্ব সাহিত্যিক ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত করিয়েছিলেন। নেপালে ছাপাখানা নিয়ে আসা থেকে শুরু করে নেপালি গজলকে প্রতিষ্ঠিত করা, শৃঙ্গার রসকে সাহিত্যিক অভিব্যক্তির মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং ‘পিকদূত’-এর মতো রচনার মাধ্যমে সাহিত্যিক দিগন্ত প্রসারিত করা—সব ক্ষেত্রেই তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি নেপালি সাহিত্যকে শুধু সৃষ্টির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সংরক্ষণ, প্রকাশনা ও প্রচারের সঙ্গে যুক্ত করার সচেতনতা সৃষ্টি করেছিলেন।
ভানুভক্তকে নেপালি সমাজের মধ্যে পরিচিত করে তোলার মোতিরামের প্রচেষ্টা কেবল একজন ব্যক্তির জীবনী প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি ছিল নেপালি ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের অনুসন্ধান। তাই আজ মোতিরামকে স্মরণ করার সময় আমাদের নিজেদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করা উচিত—আজকের সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো কি নেপালি সাহিত্যের সেই মৌলিকতা, স্বাধীনতা ও সততাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে?
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এর উত্তর সন্তোষজনক নয়। অনেক সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ প্রাধান্য পেতে দেখা যাচ্ছে। নেতৃত্ব নির্বাচনে সৃজনশীল সক্ষমতা ও সাহিত্যিক অবদানের চেয়ে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা এবং ভাগ-বাটোয়ারাকে গুরুত্ব দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হওয়া উদ্বেগজনক। সাহিত্যিক সম্মান ও পুরস্কারও নিরপেক্ষতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হচ্ছে কি না—এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পরিস্থিতি সাহিত্যজগতের জন্য একটি গুরুতর সতর্কবার্তা।
সাহিত্য সমাজের বিবেক। তাই সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক দলের প্রভাব বিস্তারের মঞ্চে পরিণত হওয়া উচিত নয়। রাজনৈতিক মতাদর্শ ব্যক্তির নিজস্ব অধিকার, কিন্তু সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া তার দ্বারা পরিচালিত হওয়া উচিত নয়। কোনো স্রষ্টার রাজনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তিতে নয়, বরং তাঁর সৃজনশীল অবদান, মৌলিকতা এবং সাহিত্যিক প্রভাবের ভিত্তিতে পুরস্কার ও সম্মান প্রদান করা উচিত।
এখন সংস্কারের জন্য সুস্পষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুরস্কার ও সম্মাননার স্বচ্ছ মানদণ্ড প্রকাশ করতে হবে। বিচারকমণ্ডলীকে রাজনৈতিক প্রভাব ও গোষ্ঠীগত চাপ থেকে মুক্ত রাখতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটিয়ে নতুন প্রজন্ম, নারী, যুবসমাজ এবং বিভিন্ন সাহিত্যিক ধারাকে যথাযথ প্রতিনিধিত্ব দিতে হবে। সরকারি ও জনসাধারণের অর্থায়নে পরিচালিত সাহিত্যিক কর্মসূচিতে আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমালোচনা গ্রহণ করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
মোতিরামের অবদান থেকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নেওয়া যায়—অগ্রজ স্রষ্টাদের পরিচিত করা এবং সম্মান দেওয়া সাহিত্যিক সংস্কারের ভিত্তি। মোতিরাম ভানুভক্তকে পরিচিত করে তুলেছিলেন; এখন আমাদের প্রজন্মের দায়িত্ব হলো নেপালি সাহিত্যের অসংখ্য অগ্রজ ও সমকালীন স্রষ্টার অবদানকে নিরপেক্ষভাবে নথিভুক্ত করা, প্রকাশ করা এবং প্রচার করা। স্রষ্টাদের গোষ্ঠীতে বিভক্ত করে নয়, তাঁদের সৃষ্টির ভিত্তিতে মূল্যায়ন করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
মোতিরাম ভট্টের জন্মজয়ন্তীকে শুধু বার্ষিক স্মরণ-অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত করা যাবে না। এই উপলক্ষকে নেপালি সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শুদ্ধিকরণ, স্বচ্ছতা ও পুনর্জাগরণের অভিযানে পরিণত করতে হবে। সাহিত্যকে রাজনৈতিক ভাগ-বাটোয়ারা থেকে মুক্ত করতে হবে। সম্মানকে প্রকৃত সম্মান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পুরস্কারকে মর্যাদার বাণিজ্য নয়, সৃষ্টিশীলতার স্বীকৃতিতে পরিণত করতে হবে।
মোতিরাম তাঁর স্বল্প জীবনে নেপালি সাহিত্যে যে শক্তি ও উদ্দীপনা দিয়েছিলেন, তা আজও সমানভাবে অনুপ্রেরণাদায়ক। তিনি ভানুভক্তকে সমাজে পরিচিত করে তুলেছিলেন; এখন আমাদের দায়িত্ব মোতিরামসহ সমগ্র নেপালি সাহিত্যের মর্যাদা রক্ষা করা। সাহিত্য ক্ষমতার ছায়ায় নয়, সত্য ও সৃষ্টিশীলতার আলোয় দাঁড়িয়ে থাকবে। আমরা যদি এই সংস্কার গড়ে তুলতে পারি, তবেই মোতিরাম ভট্টের ১৬১তম জন্মজয়ন্তী প্রকৃত অর্থে সার্থক হবে।





