দেবেন্দ্রকিশোর ঢুঙানা
ভদ্রপুর: নেপালের প্রাচীনতম গণতান্ত্রিক দল নেপালি কংগ্রেস বর্তমানে আবারও এক গভীর অভ্যন্তরীণ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সভাপতি শেরবাহাদুর দেউবা শিবির এবং মহাসচিব গগন কুমার থাপা শিবিরের মধ্যে বিরোধ কেবল নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা নয়; এটি দলের বৈধতা, প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এবং ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার সঙ্গে জড়িত একটি জটিল প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। সর্বোচ্চ আদালতে বিচারাধীন দলীয় বৈধতা সংক্রান্ত মামলাটি এখন কংগ্রেসের রাজনৈতিক অস্তিত্বকেই ধরে রেখেছে।
দেউবা পক্ষ বিশেষ মহাধিবেশনকে সম্পূর্ণ অবৈধ বলে দাবি করে যুক্তি দিয়েছে যে সভাপতির বাইরে অন্য কেউ এর সভাপতিত্ব করতে পারেন না। জ্যেষ্ঠ আইনজীবী রমন কুমার শ্রেষ্ঠর যুক্তি এই বিতর্ককে কেবল কারিগরি বিষয় হিসেবে নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ও দলীয় বিধির মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত করেছে। যদি দলীয় নিয়ম লঙ্ঘিত হয়ে থাকে, তবে তা দলের মৌলিক কাঠামোকেই দুর্বল করে দিতে পারে।
অন্যদিকে, গগন থাপা পক্ষ দাবি করছে যে বিশেষ মহাধিবেশনের মাধ্যমে নতুন কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়েছে। তার সঙ্গে মহাসচিব বিশ্ব প্রকাশ শর্মাও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন। তাদের যুক্তি হলো, দলের ভেতরের স্থবিরতা, নেতৃত্বের নিষ্ক্রিয়তা এবং বাহ্যিক চাপের কারণে বিকল্প পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে—বিকল্প পদক্ষেপের নামে কি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ও বৈধতাকে উপেক্ষা করা যায়?
আসলে, এই বিরোধের বীজ রোপিত হয়েছিল প্রতিনিধি সভা নির্বাচনের আগেই। দলের অভ্যন্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ, নেতৃত্বের প্রতি অবিশ্বাস এবং বাহ্যিক প্রভাবের অভিযোগ কংগ্রেসকে ভেতর থেকেই দুর্বল করে দেয়। “কিত্তা ক্লিয়ার” করার উদ্দেশ্যে আয়োজিত বিশেষ মহাধিবেশন স্বল্পমেয়াদে কিছু গোষ্ঠীকে শক্তিশালী করলেও দীর্ঘমেয়াদে দলের ঐক্য ও বিশ্বাসযোগ্যতায় আঘাত হেনেছে।
নির্বাচনে কংগ্রেসের প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল ফলাফলও এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ফল বলে মনে করা হয়। যখন দলের ভেতরেই নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ চলে, তখন তার সরাসরি প্রভাব জনমনে পড়ে। নেতৃত্বের ওপর “আত্মঘাতী আঘাত” ধরনের কর্মকাণ্ড শুধু দলকে দুর্বল করে না, জনগণের আস্থাও কমিয়ে দেয়।
এই বিরোধের আরেকটি গুরুতর দিক হলো নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ। দেউবা পক্ষের দাবি, কমিশন যথাযথ তদন্ত ছাড়াই তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নিয়েছে; এমনকি জাল স্বাক্ষর এবং মৃত বা বিদেশে অবস্থানরত কর্মীদের নামও ব্যবহার করা হয়েছে। যদি এসব অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তবে এটি কেবল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ সমস্যা থাকবে না, বরং দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও প্রশ্ন তুলবে।
এই প্রেক্ষাপটে সর্বোচ্চ আদালতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আদালত শুধু আইনি ব্যাখ্যাই দেবে না, বরং একটি তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তাও দেবে। অতীতে দলভাগ সংক্রান্ত ঘটনাগুলো দেখিয়েছে যে আদালতের রায় রাজনৈতিক দলগুলোর কাঠামো ও ভবিষ্যৎকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
যদি আদালত দেউবা পক্ষের যুক্তি মেনে নেয়, তবে গগন থাপার নেতৃত্বাধীন কমিটি ভেঙে যেতে পারে এবং দল পুরোনো কাঠামোয় ফিরে যেতে পারে। এতে তাৎক্ষণিক স্থিতিশীলতা আসতে পারে, কিন্তু অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ আরও বাড়ার সম্ভাবনাও থাকবে। অন্যদিকে, যদি বিশেষ মহাধিবেশনকে বৈধতা দেওয়া হয়, তবে দলের আনুষ্ঠানিক বিভাজনের ঝুঁকি আরও বেড়ে যাবে।
মূল প্রশ্ন হলো, শুধুমাত্র আদালতের রায় কি কংগ্রেসকে বাঁচাতে পারবে? এর উত্তর সহজ নয়। আদালত আইনি স্পষ্টতা দিতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক সমাধান দলকেই খুঁজে নিতে হবে। পারস্পরিক সংলাপ, সমঝোতা এবং বিশ্বাস ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তই স্থায়ী সমাধান হতে পারে না।
আজ কংগ্রেস এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে এটি যেন “কোমা”-র মতো অবস্থায়—সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়, কিন্তু ধীরে ধীরে তার শক্তি হারাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে নেতৃত্বের আত্মসমালোচনা অত্যন্ত জরুরি। ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও গোষ্ঠীগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে প্রাতিষ্ঠানিক ঐক্য এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার দেওয়া অপরিহার্য।
কংগ্রেস কেবল একটি রাজনৈতিক দল নয়; এটি নেপালের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। এর দুর্বলতা পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এই বিরোধ কেবল অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং গণতন্ত্রের স্থিতিশীলতার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
অবশেষে, সর্বোচ্চ আদালতের রায় কংগ্রেসের জন্য “নবজীবন” হয়ে উঠতে পারে—কিন্তু তখনই, যখন দলের সব পক্ষ তা মেনে নিয়ে ঐক্যের পথ বেছে নেবে। অন্যথায়, এই বিরোধ দলকে আরও গভীর বিভাজনের দিকে ঠেলে দেবে, যার মূল্য শুধু দল নয়, পুরো দেশকেই দিতে হতে পারে।









