স্টিল শিল্পের সম্প্রসারণের সঙ্গে ভারত বৈশ্বিক ফেরো–অ্যালয় হাব হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারে: আইএফএপিএ

d92eb044-dbd3-4df2-9f3c-96b47dd464c9

নয়াদিল্লি: ভারতে দ্রুত সম্প্রসারিত স্টিল শিল্প দেশীয় ফেরো–অ্যালয় ক্ষেত্রের জন্য নতুন উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করার পাশাপাশি বৈশ্বিক বাজারে ভারতের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলছে। ইন্ডিয়ান ফেরো অ্যালয় প্রোডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশন (আইএফএপিএ) গোয়ায় অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ ইন্টারন্যাশনাল ফেরো অ্যালয়জ কনফারেন্স (আইএফএসি–২০২৬)-এ এই কথা জানিয়েছে।
আইএফএপিএ-এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনের মূল বিষয় ‘ভারতের স্টিল বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করা : ফেরো–অ্যালয়ের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব’। সম্মেলনে সম্পদ সুরক্ষার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়ে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজের প্রাপ্যতা, শক্তি দক্ষতা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যকে প্রধান বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ভারতের অপরিশোধিত স্টিল উৎপাদন ২০২৫ সালে প্রায় ১৬৫ মিলিয়ন টন-এ পৌঁছেছিল, যা আগের বছরের তুলনায় ১০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি। আগামী বছরগুলিতে স্টিলের চাহিদা বার্ষিক প্রায় ৭ শতাংশ হারে বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ স্টিলের ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে ম্যাঙ্গানিজ, ক্রোমিয়াম, সিলিকন এবং অন্যান্য সংকর ধাতু সম্পর্কিত কাঁচামালের চাহিদা ও বাজারও সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভারত ২০৩০–৩১ অর্থবর্ষের মধ্যে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন টন স্টিল উৎপাদন ক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য নিয়েছে। এর ফলে ম্যাঙ্গানিজ, ক্রোমিয়াম, সিলিকন এবং অন্যান্য সংকর ধাতু সম্পর্কিত কাঁচামালের চাহিদায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মাথাপিছু স্টিলের ব্যবহারেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি
ভারত স্টিল ব্যবহারের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি করেছে। ১৯৯১ সালে মাথাপিছু স্টিলের ব্যবহার ছিল প্রায় ২৪ কিলোগ্রাম, যা ২০২৫ সালে বেড়ে প্রায় ১০৯ কিলোগ্রাম হয়েছে।
মাথাপিছু স্টিলের ব্যবহার ১০০ কিলোগ্রাম ছাড়িয়ে যাওয়ার পর অর্থনৈতিক ও শিল্প সম্প্রসারণের পরবর্তী পর্যায়ে স্টিলের চাহিদা আরও বাড়তে পারে। এর সরাসরি প্রভাব স্টিল উৎপাদনে প্রয়োজনীয় ফেরো–অ্যালয়ের চাহিদার ওপরও পড়তে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
আইএফএপিএ-এর সভাপতি মণীশ সারদা বলেছেন, বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াতে এবং ‘আত্মনির্ভর ভারত’-এর লক্ষ্যকে সমর্থন করতে ভারতীয় ফেরো–অ্যালয় উৎপাদকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের দেশীয় উৎস সুরক্ষিত করা অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, ভারতকে দেশীয় ম্যাঙ্গানিজ, ক্রোম এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজের অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও উৎপাদন প্রক্রিয়ায় আরও গতি আনতে হবে।
তিনি বলেন, “অনেক ম্যাঙ্গানিজ আকরিক খনি উচ্চ প্রিমিয়ামে নিলাম করা হলেও সেগুলির অনেকগুলি এখনও চালু করা সম্ভব হয়নি। এর প্রধান কারণ কিছু খনির অর্থনৈতিক কার্যকারিতা অনুকূল নয়। তাই খনি নিলামের ব্যবস্থায় শুধুমাত্র সর্বোচ্চ দরদাতাকে অগ্রাধিকার না দিয়ে প্রকৃত খনি উন্নয়ন ও উৎপাদনকে উৎসাহিত করা উচিত।”
সারদার মতে, একটি উৎপাদনশীল খনি শিল্প ও অর্থনীতির জন্য মূল্য সৃষ্টি করে, অন্যদিকে অর্থনৈতিকভাবে অকার্যকর খনি সেই ধরনের অবদান রাখতে পারে না। দেশীয় খনিজ সম্পদে বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং একটি শক্তিশালী ও আত্মনির্ভর ফেরো–অ্যালয় শিল্প গড়ে তোলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
উৎপাদন ব্যয়কে প্রতিযোগিতামূলক করার ওপর জোর
ভারত ৩০০ মিলিয়ন টন স্টিল উৎপাদন ক্ষমতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় আইএফএপিএ উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামালের ব্যয়কে প্রতিযোগিতামূলক করার প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দিয়েছে।
অ্যাসোসিয়েশনটি পরামর্শ দিয়েছে, যেখানে পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন দেশীয় কাঁচামাল পাওয়া যায় না, সেখানে ম্যাঙ্গানিজ আকরিক এবং নোবেল অ্যালয় উৎপাদনে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানির ওপর শূন্য শুল্ক আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।
এছাড়াও, শক্তি–নির্ভর ফেরো–অ্যালয় শিল্পের জন্য প্রতিযোগিতামূলক বিদ্যুৎ হার নিশ্চিত করা এবং বিদ্যুৎ সম্পর্কিত শুল্ক ও লেভি যুক্তিসঙ্গত করারও দাবি জানানো হয়েছে।
স্টিল উৎপাদনে ফেরো–অ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
ফেরো–অ্যালয় হলো লোহার সঙ্গে ম্যাঙ্গানিজ, ক্রোমিয়াম, সিলিকনের মতো উপাদান মিশিয়ে তৈরি সংকর ধাতু। এগুলি স্টিলের শক্তি, কঠোরতা এবং ক্ষয় প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অবকাঠামো, অটোমোবাইল, রেলওয়ে, প্রতিরক্ষা এবং বিভিন্ন বিশেষ শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় স্টিল উৎপাদনে ফেরো–অ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সেই কারণেই স্টিল শিল্পের সম্প্রসারণের সঙ্গে ফেরো–অ্যালয় শিল্পের কৌশলগত গুরুত্বও বাড়ছে।
সিলিকো–ম্যাঙ্গানিজ ও ফেরো–ম্যাঙ্গানিজ উৎপাদনে বৃদ্ধি
স্টিলের চাহিদা ও উৎপাদন কাঠামোর পরিবর্তনের ফলে ফেরো–অ্যালয় শিল্পের জন্য সুযোগও সম্প্রসারিত হয়েছে।
বিগমিন্টের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে সিলিকো–ম্যাঙ্গানিজের উৎপাদন ২০১৯–২০ অর্থবর্ষে প্রায় ১.৯ মিলিয়ন টন ছিল, যা ২০২৫–২৬ অর্থবর্ষে বেড়ে প্রায় ৩.৫ মিলিয়ন টন হয়েছে।
একই সময়ে ফেরো–ম্যাঙ্গানিজের উৎপাদনও প্রায় ০.৯ মিলিয়ন টন থেকে বেড়ে ১.৭ মিলিয়ন টন হয়েছে। উৎপাদনের এই বৃদ্ধি ভারতের সম্প্রসারিত স্টিল ক্ষেত্র থেকে ফেরো–অ্যালয়ের ক্রমবর্ধমান চাহিদার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ম্যাঙ্গানিজ অ্যালয় রপ্তানিতে ভারত শীর্ষে
বিগমিন্টের মতে, ২০২৫ সালে ভারত ছিল বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ম্যাঙ্গানিজ অ্যালয় রপ্তানিকারক।
ক্রমবর্ধমান দেশীয় বাজারের পাশাপাশি ভারতের ইতিমধ্যেই একটি প্রতিষ্ঠিত রপ্তানি বাজার রয়েছে। এর ফলে ভারতীয় উৎপাদকরা উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার সুযোগ পাচ্ছেন।
তবে কাঁচামালের সরবরাহ নিরাপত্তা এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ভারতের ম্যাঙ্গানিজ আকরিক আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৭ শতাংশ বেড়ে ৪.০৩ মিলিয়ন টন হয়েছে।
একইভাবে, ২০২৫–২৬ অর্থবর্ষে ক্রোম আকরিকের উৎপাদন ১২ শতাংশ বেড়ে ৩.৫৩ মিলিয়ন টন হয়েছে। একই সময়ে ফেরো–ক্রোমের উৎপাদনও ১০ শতাংশ বেড়ে ১.৪৯ মিলিয়ন টন হয়েছে।
এই পরিসংখ্যান একদিকে কাঁচামাল আমদানির সঙ্গে যুক্ত চ্যালেঞ্জকে তুলে ধরছে, অন্যদিকে ভারতেই আরও বেশি মূল্য সংযোজনের সম্ভাবনাও সামনে আনছে।
আইএফএসি–২০২৬-এ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিল্প প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ
গোয়ায় অনুষ্ঠিত আইএফএসি–২০২৬-এ ৭০০-র বেশি অংশগ্রহণকারী, ৩৫ জন বক্তা এবং ১৫টিরও বেশি জ্ঞানভিত্তিক অধিবেশন রয়েছে।
সম্মেলনে ম্যাঙ্গানিজ সম্পদ সুরক্ষা, স্টিল ও অ্যালয়ের চাহিদা, বৈশ্বিক বাণিজ্য, ফেরো–ক্রোম ও ফেরো–সিলিকন, শক্তি দক্ষতা এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে সারদা গ্রুপ, এমওআইএল, জেএসডব্লিউ স্টিল, এমএফএ, শ্যাম মেটালিক্স, এরামেট, দ্য সান্ডুর ম্যাঙ্গানিজ অ্যান্ড আয়রন ওরস লিমিটেড (এসএমআইওআরই), সেল, সুমিতোমো মেটাল মাইনিং, নাভা লিমিটেড, হীরা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ এবং ইন্টারন্যাশনাল ম্যাঙ্গানিজ ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও শিল্প সংস্থার শীর্ষস্থানীয় প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন।
ভারতে স্টিল উৎপাদন ও ব্যবহার উভয়ই সম্প্রসারিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে কাঁচামালের দেশীয় উৎসের উন্নয়ন, শক্তি ব্যয়ে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা, আমদানি নীতিতে সংস্কার এবং রপ্তানি বাজারের সম্প্রসারণের মতো বিষয়গুলি ফেরো–অ্যালয় শিল্পের ভবিষ্যৎ দিককে প্রভাবিত করবে।
সম্মেলনে এসব বিষয়কে ভারতের শিল্পোন্নয়ন এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে ভারতের ভূমিকার সঙ্গে যুক্ত করে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

About Author

Advertisement