দেং-এর উত্থান-পতনের কাহিনি: মাও তাঁকে শ্রমশিবিরে পাঠিয়েছিলেন, আবার মাও-ই তাঁকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে এনেছিলেন

7b0afad4-355a-497f-a5e9-5783c3a9e347

বেইজিং: দেং শিয়াওপিং একসময় চীনের কমিউনিস্ট শাসনব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। তিনি বিপ্লবে অংশ নিয়েছিলেন, উপপ্রধানমন্ত্রী হিসেবে কাজ করেছিলেন এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদকও হয়েছিলেন।
তিনি মাওয়ের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যবস্থারই একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন; সেই ব্যবস্থা ধ্বংস করার চেষ্টা করা কোনো বহিরাগত ব্যক্তি ছিলেন না। কিন্তু উনিশশো ছেষট্টি সালে সাংস্কৃতিক বিপ্লব শুরু হয়।
দেং শিয়াওপিংয়ের বিরুদ্ধে ‘পুঁজিবাদী পথে চলা ব্যক্তি’ হওয়ার অভিযোগ আনা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি চীনকে মাওবাদী বিপ্লবী আদর্শ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যেতে চাইছেন।
এরপর তাঁর রাজনৈতিক ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ে এবং তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। উনিশশো ঊনসত্তর সালে দেংকে চীনের জিয়াংসি প্রদেশে পাঠানো হয়। একসময় দলের শীর্ষ নেতৃত্বে থাকা দেংকে সেখানে একটি ট্র্যাক্টর কারখানায় কাজ করতে হয়।
তাঁর মেয়ের পরবর্তী বিবরণ অনুযায়ী, তাঁকে কঠোর বিধিনিষেধ এবং সশস্ত্র নিরাপত্তার নজরদারির মধ্যে কাজ করতে হতো। এই ঘটনার ব্যক্তিগত বিবরণ মূলত তাঁর পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যের ওপর নির্ভরশীল। তবে তাঁর জীবনে যে বড় পরিবর্তন এসেছিল, তা স্পষ্ট—চীনা সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বে থাকা একজন ব্যক্তি এখন রাজনৈতিক নির্বাসনে থেকে শিল্পকারখানায় কাজ করছেন।
মাও তাঁকে চিরতরে পরিত্যাগ করেননি
উনিশশো তিয়াত্তর সালে দেং শিয়াওপিংকে আবার রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়। প্রধানমন্ত্রী চৌ এনলাই তাঁর পুনর্বহালের পক্ষে সমর্থন জানান এবং মাওও তাঁর প্রত্যাবর্তনে সম্মতি দেন।
উনিশশো পঁচাত্তর সালের মধ্যে দেং আবার সরকারের উচ্চপর্যায়ে পৌঁছে যান। তিনি প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক উৎপাদন এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিতে শুরু করেন। কিন্তু এর ফলে নতুন একটি সমস্যার সৃষ্টি হয়।
দেংয়ের কাজের ধরন ও চিন্তাভাবনার সঙ্গে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় প্রভাবশালী হয়ে ওঠা কট্টরপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর বিরোধ ক্রমশ বাড়তে থাকে।
উনিশশো ছিয়াত্তর সালের জানুয়ারিতে চৌ এনলাইয়ের মৃত্যু হয়। তাঁর প্রতি মানুষের শোক দ্রুত একটি বড় রাজনৈতিক প্রতিবাদে রূপ নেয়।
এপ্রিল মাসে বেইজিংয়ের থিয়েনআনমেন চত্বরে বিক্ষোভ হয়। তৎকালীন কর্তৃপক্ষ এই বিক্ষোভের নিন্দা করে এবং সৃষ্ট অস্থিরতার জন্য দেংকে দায়ী করে।
উনিশশো ছিয়াত্তর সালের সাতই এপ্রিল মাওয়ের সম্মতিতে দেংকে আবার তাঁর সব রাজনৈতিক পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

মাওয়ের মৃত্যুর পরও দেং সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতায় আসেননি

উনিশশো ছিয়াত্তর সালের সেপ্টেম্বরে মাওয়ের মৃত্যু হয়। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর দেং সঙ্গে সঙ্গে চীনের নেতৃত্ব পাননি। হুয়া গুওফেং গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পদগুলিতে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছিলেন। ওই বছরের অক্টোবর মাসে ‘গ্যাং অব ফোর’ বা চার কট্টরপন্থী নেতার গোষ্ঠীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
দেং মাওয়ের স্থলাভিষিক্ত হয়ে সরাসরি ক্ষমতা গ্রহণের সুযোগ পাননি। তাঁকে আবার নিজের রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করতে হয়।
উনিশশো সাতাত্তর সালের জুলাই মাসে দেংয়ের রাজনৈতিক পুনর্বহালের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয়। কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি চীনের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতায় পরিণত হন। যদিও তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে কখনো রাষ্ট্রপ্রধানের পদে অধিষ্ঠিত হননি, বাস্তবে চীনের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাঁর হাতেই কেন্দ্রীভূত হয়েছিল।
ট্র্যাক্টর কারখানা থেকে চীনের রূপান্তর
একসময় ট্র্যাক্টর কারখানায় কাজ করতে বাধ্য হওয়া দেং শিয়াওপিং পরবর্তী সময়ে মাও-পরবর্তী চীনকে সম্পূর্ণ নতুন পথে এগিয়ে নিয়ে যান।
তিনি ‘সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ’ নীতি এগিয়ে নিয়ে যান। বিদেশি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করেন, বাজারভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটান এবং শেনঝেনের মতো বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
এই নীতিগুলি কয়েক দশক ধরে চীনের দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার ভিত্তি তৈরি করে। তবে দেংয়ের উত্তরাধিকারকে শুধু অর্থনৈতিক সাফল্যের গল্প হিসেবে দেখা যায় না।

উনিশশো ঊননব্বই সালের থিয়েনআনমেন দমন-পীড়ন: দেংয়ের উত্তরাধিকারের অন্ধকার দিক

উনিশশো ঊননব্বই সালে বেইজিংয়ে গণতন্ত্রের দাবিতে একটি বিশাল গণআন্দোলন গড়ে ওঠে। সেই আন্দোলন দমনে পরিচালিত সামরিক অভিযানে দেং শিয়াওপিং সমর্থন দিয়েছিলেন।
এটি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বিতর্কিত ও অন্ধকার অধ্যায়গুলির একটি। এই দমন-পীড়ন ও সংশ্লিষ্ট সহিংসতায় শত শত মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন বলে অনুমান করা হয়, যদিও প্রকৃত নিহতের সংখ্যা আজও বিতর্কিত।
উনিশশো সাতানব্বই সালে বিরানব্বই বছর বয়সে দেং শিয়াওপিংয়ের মৃত্যু হয়।
দেং শিয়াওপিংয়ের অসাধারণ রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল বিপ্লবের মধ্য দিয়ে। তিনি দুবার রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযানের শিকার হন, তাঁকে ট্র্যাক্টর কারখানায় কাজ করতে হয় এবং শেষ পর্যন্ত তিনি মাও-পরবর্তী চীনের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতায় পরিণত হন।
মাও দেংকে দুবার ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু দুইবারই দেং ফিরে এসেছিলেন।
দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফিরে তিনি তাঁর ক্ষমতা শুধু পুরোনো ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার কাজে ব্যবহার করেননি। বরং মাওয়ের রেখে যাওয়া চীনকে একটি নতুন অর্থনৈতিক পথে পরিচালিত করেন।
তাঁর নেতৃত্বে চীন সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামো বজায় রেখেই বাজারভিত্তিক অর্থনৈতিক সংস্কার এগিয়ে নিয়ে যায়। এই প্রক্রিয়া আধুনিক চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মূল বার্তা: রাজনৈতিক জীবনে দুবার পতনের মুখোমুখি হওয়া দেং শিয়াওপিং প্রত্যাবর্তন করে চীনের অর্থনৈতিক গতিপথই বদলে দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর অর্থনৈতিক উন্নয়নের উত্তরাধিকারের পাশাপাশি উনিশশো ঊননব্বই সালের সামরিক দমন-পীড়নের দায়ও ইতিহাসে জড়িয়ে রয়েছে।
সূত্র: কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস—মাও সে তুং ও দেং শিয়াওপিংয়ের নেতৃত্বে চীনের রূপান্তর সম্পর্কিত উপকরণ।

About Author

Advertisement