— দেশবন্ধু বিশ্বামিত্র
«‘ভদ্রপুর–গলগলিয়া নাকা এখন আর শুধু যাতায়াতের পথ নয়; মাদকদ্রব্যের নেটওয়ার্ক, নিরাপত্তার দুর্বলতা এবং সীমান্তপারের অপরাধের নতুন পরীক্ষাক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে।’» ভারতের বিহার রাজ্যের কিশনগঞ্জ জেলার গলগলিয়া থানা নেপালের সঙ্গে যুক্ত একটি সাধারণ সীমান্তবর্তী নিরাপত্তা ইউনিট মাত্র নয়। এর ভৌগোলিক অবস্থানই অত্যন্ত সংবেদনশীল—একদিকে নেপাল, অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গ–বিহার এবং মাঝখানে উন্মুক্ত সীমান্তের জটিল সামাজিক–অর্থনৈতিক সম্পর্ক। এই সংবেদনশীল ভূগোলে কর্মরত গলগলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক রাকেশ কুমার বর্তমানে বরখাস্ত হয়েছেন। কিন্তু এই বরখাস্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক শুধু তাঁর পদ হারানো নয়। প্রশ্ন আরও গভীর—মাদক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা সীমান্তবর্তী পুলিশ কাঠামোর মধ্যেই যখন সন্দেহজনক আচরণের প্রশ্ন উঠতে শুরু করে, তখন সীমান্তপারের মাদক নেটওয়ার্কের প্রকৃত গভীরতা কতটা? কিশনগঞ্জের পুলিশ সুপার সন্তোষ কুমার গলগলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রাকেশ কুমারকে বরখাস্ত করেছেন—এমন প্রকাশ্য বিবরণ অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে কর্তব্যে অবহেলা, সন্দেহজনক আচরণ, শৃঙ্খলাভঙ্গ, স্বেচ্ছাচারিতা এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশ অমান্য করার অভিযোগে বিভাগীয় ব্যবস্থা শুরু করা হয়েছে। ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ গলগলিয়া এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানের সময় তাঁর কাজের ধরন নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর এসডিপিও–২-এর মাধ্যমে প্রাথমিক তদন্ত করা হয় এবং সেই প্রতিবেদনের পর তাঁকে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এই ঘটনাকে কয়েকটি স্থানীয় প্রতিবেদন নেপালের দিকে মাদক সরবরাহকারী চক্রের সঙ্গে সম্ভাব্য যোগসাজশের দিক থেকেও তুলে ধরেছে। তবে সেই অভিযোগ এবং বরখাস্তের মধ্যে সম্পর্ক আদালত বা চূড়ান্ত বিভাগীয় তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে—এমন প্রকাশ্য প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। তাই ঘটনাটির প্রকৃত অর্থ বোঝার ক্ষেত্রে ‘পুলিশ কর্মকর্তা দোষী’—এমন সিদ্ধান্তের পরিবর্তে বলা অধিক তথ্যভিত্তিক হবে যে সীমান্তবর্তী নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভ্যন্তরে সম্ভাব্য দুর্বলতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। তিন কোটি টাকার মাদক উদ্ধারে যে বড় প্রশ্ন গলগলিয়া এলাকায় কয়েক দিন আগে পরিচালিত যৌথ অভিযানে প্রায় তিন কোটি ভারতীয় রুপি মূল্যের বিপুল পরিমাণ মাদক এবং একটি পিস্তলসহ দুই মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তারের তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। অন্য একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই অভিযানে এক হাজার ৩২১ গ্রাম এমডিএমএ এবং ব্রাউন সুগার উদ্ধার করা হয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় তিন কোটি রুপি। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি কোনো একক ঘটনা বলে মনে হচ্ছে না। ২০২৬ সালেই গলগলিয়া ও কিশনগঞ্জের আশপাশ থেকে ৪০৪ গ্রাম ব্রাউন সুগার, ১২০ গ্রাম ব্রাউন সুগারের সঙ্গে ভারতীয় ও নেপালি মুদ্রা, ৩৬৩ গ্রাম ব্রাউন সুগার এবং বিভিন্ন পরিমাণের অন্যান্য মাদক উদ্ধার হওয়ার ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। কয়েকটি অভিযানে নেপালি নাগরিকদেরও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এতে একটি বিষয় স্পষ্ট—গলগলিয়া–কিশনগঞ্জ অঞ্চল মাদকদ্রব্যের দিক থেকে একটি সক্রিয় সীমান্ত করিডর। এর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি উদ্ধার হওয়া চালান নেপালে যাওয়ার জন্য ছিল। তবে নেপাল–ভারত সীমান্তের উভয় পাশেই মাদক ব্যবসা সক্রিয় থাকার প্রমাণ এসব ঘটনা থেকে পাওয়া যায়। কাঁকরভিট্টা থেকে বির্তামোড় পর্যন্ত : ঝাপার ‘ড্রাগ করিডর’ কতটা বড়? নেপালের দিকের চিত্রও কম গুরুতর নয়। নেপাল পুলিশের পরিসংখ্যান দেখায়, কোশি প্রদেশে মাদক-সংক্রান্ত অপরাধ একটি বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। গত তিন অর্থবছরে প্রদেশে মাদক-সংক্রান্ত নথিভুক্ত মামলা এক হাজার ৩৯ থেকে বেড়ে এক হাজার ৪৩৭ হয়েছে এবং পরবর্তী অর্থবছরে তা এক হাজার ৩১৩-তে দাঁড়িয়েছে। ওই সময়ে গাঁজা, ব্রাউন হেরোইন এবং মনঃপ্রভাবী ওষুধও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে ঝাপা বিশেষভাবে সংবেদনশীল বলে মনে হয়। নেপাল পুলিশের সাম্প্রতিক অভিযানের বিবরণে ঝাপার বির্তামোড়, দামক এবং ভদ্রপুর থেকে ব্রাউন সুগার ও নিয়ন্ত্রিত ওষুধসহ ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের উদাহরণ ধারাবাহিকভাবে দেখা যায়। জুন ২০২৬-এর একটি ‘সুইপ অপারেশন’-এ শুধু ঝাপা থেকেই ৮৩ জন ব্যবহারকারী এবং নয় জন ব্যবসায়ীসহ মোট ৯২ জনকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয় এবং ব্রাউন হেরোইনের মতো পদার্থ উদ্ধার করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে বির্তামোড়, দামক ও ভদ্রপুরের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও ছিলেন। নেপাল পুলিশের বিবরণেই বির্তামোড়ে ব্রাউন সুগারসহ গ্রেপ্তার, দামকে ট্রামাডল এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রিত ওষুধের বড় পরিমাণসহ গ্রেপ্তার এবং কাঁকরভিট্টায় এক ভারতীয় নাগরিকের কাছ থেকে ব্রাউন হেরোইনের মতো পদার্থ ও নিয়ন্ত্রিত ওষুধ উদ্ধারের ঘটনাও পাওয়া যায়। আরও সরাসরি সীমান্তপারের ইঙ্গিত পাওয়া যায় এমন একটি ঘটনায় ভদ্রপুরের মেচি সেতু দিয়ে ভারত থেকে নেপালের দিকে পায়ে হেঁটে আসা এক ব্যক্তির কাছ থেকে ৬.৫৪ গ্রাম ব্রাউন সুগারের মতো পদার্থ উদ্ধার করা হয়েছিল বলে নেপাল পুলিশের নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এ থেকে কী বোঝা যায়? কাঁকরভিট্টা সীমান্ত প্রবেশ/ট্রানজিট পয়েন্ট, ভদ্রপুর সীমান্তপারের যোগাযোগের পয়েন্ট এবং বির্তামোড়–দামক অভ্যন্তরীণ বাজার/বিতরণ এলাকা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে—এমন একটি শক্তিশালী তদন্তের দিক দেখা যাচ্ছে। তবে এটিকে ‘ঝাপাই মাদক পাচারের কেন্দ্র’—এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও বিস্তারিত মামলা, উদ্ধার হওয়া মাদকের উৎস, আর্থিক লেনদেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের নেটওয়ার্ক এবং আদালতের রায়কে একত্রে বিশ্লেষণ করতে হবে। সীমান্তে মাদকের পুরনো গল্প : অতীত থেকে বর্তমান ভারত–নেপাল সীমান্তে মাদক ব্যবসা নতুন সমস্যা নয়। ২০০৯ সালেই কিশনগঞ্জের গলগলিয়া থানা এলাকার নেপাল সীমান্তে প্রায় এক কোটি ভারতীয় রুপি মূল্যের বলে উল্লেখ করা ব্রাউন সুগার উদ্ধার এবং তার কয়েক দিনের মধ্যেই আরও একটি বড় উদ্ধার অভিযানের খবর সংবাদ আর্কাইভে পাওয়া যায়। তখনও এসএসবি নেপালের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা মাদক উদ্ধার করেছিল। অর্থাৎ বর্তমানে গলগলিয়া–নেপাল সীমান্তে যে মাদক কার্যকলাপ দেখা যাচ্ছে, তা হঠাৎ তৈরি হওয়া কোনো সমস্যা নয়। অন্তত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে এই ভূগোল মাদক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সংবেদনশীল হয়ে রয়েছে বলে দেখা যায়। পার্থক্য শুধু এটুকু—আজকের নেটওয়ার্ক আগের তুলনায় আরও সংগঠিত, বহুস্তরীয় এবং সীমান্তপারের হয়ে উঠছে—এমন ইঙ্গিত বাড়ছে। ‘উন্মুক্ত সীমান্ত’ সুযোগও, অপরাধীদের জন্য কাঠামোও নেপাল ও ভারতের মধ্যকার উন্মুক্ত সীমান্ত দুই দেশের লাখ লাখ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করেছে। কর্মসংস্থান, ব্যবসা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পারিবারিক সম্পর্ক এবং স্থানীয় বাজার এই সীমান্তের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এই সহজ যাতায়াতকে সংগঠিত অপরাধীরা অপব্যবহার করতে পারে। মাদক পাচারের ক্ষেত্রে বড় চালান একসঙ্গে সীমান্ত পার করার পরিবর্তে ছোট ছোট চালান ‘কুরিয়ার’-এর মাধ্যমে পাঠানো, স্থানীয় বিতরণকারীদের ব্যবহার করা, ডিজিটাল যোগাযোগ রাখা এবং অর্থ অন্য মাধ্যমে ঘোরানো—এ ধরনের কাঠামো কার্যকর হতে পারে। তাই শুধু সীমান্ত চৌকিতে গ্রেপ্তারের সংখ্যা বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রশ্ন হলো—উদ্ধার করা মাদক কোথা থেকে এল, কে পাঠাল, টাকা কে দিল, স্থানীয় বিতরণকারী কে, সীমান্তপারের কোন যোগাযোগ ব্যবহার করা হয়েছিল এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পেছনের আর্থিক ও যোগাযোগ নেটওয়ার্ক কত দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। সবচেয়ে বিপজ্জনক মোড় : নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভেতরে আস্থার সংকট রাকেশ কুমার-কাণ্ডের গুরুত্ব এখানেই। যদি কোনো নিরাপত্তা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মাদকবিরোধী অভিযানের সময় কর্তব্যে শিথিলতা বা সন্দেহজনক আচরণের অভিযোগ ওঠে, তাহলে তার প্রভাব শুধু একজন ব্যক্তির বিভাগীয় কর্মজীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সীমান্ত এলাকায় কর্মরত পুলিশের ওপর স্থানীয় জনগণের আস্থা, তথ্য আদানপ্রদান, তথ্যদাতা ব্যবস্থা এবং নেপাল–ভারত নিরাপত্তা সমন্বয়—সবকিছুর সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। তবে এখানে একটি আইনি সতর্কতা অত্যন্ত জরুরি। বরখাস্ত হওয়া দোষী সাব্যস্ত হওয়া নয়। উপলব্ধ প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী রাকেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে এবং প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগগুলোকে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো বলে বিবেচনা করা হয়েছে। চূড়ান্ত দায়িত্ব বা মাদক পাচারে সরাসরি সম্পৃক্ততা প্রমাণের জন্য আরও তদন্ত ও প্রমাণ প্রয়োজন। তাই এই ঘটনাকে ‘ভারতীয় পুলিশই পাচারের সঙ্গে জড়িত’—এমন সাধারণীকরণ করা তথ্যভিত্তিক হবে না। বরং এটি সীমান্তবর্তী পুলিশের অভ্যন্তরীণ নজরদারি, সম্পত্তি যাচাই, ফোন যোগাযোগ, তথ্য ফাঁস, অভিযানের আগাম খবর এবং বিভাগীয় জবাবদিহিতা নিয়ে তদন্তের প্রয়োজনীয়তা সামনে আনে। নেপালের দিকেও আয়না ফেরাতে হবে সীমান্তপারের মাদককে শুধু ভারত থেকে নেপালে আসা সমস্যা হিসেবে দেখা অসম্পূর্ণ বিশ্লেষণ হবে। নেপালের ভেতরেও চাহিদা রয়েছে। ব্যবহারকারী রয়েছে। স্থানীয় বিতরণকারী রয়েছে। অর্থ প্রদানকারী বাজার রয়েছে। হোটেল, পরিবহন, ভাড়া করা ঘর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অন্যান্য মাধ্যম ব্যবহারকারী কাঠামো থাকতে পারে। কোশি প্রদেশে গত অর্থবছরে মাদক-সংক্রান্ত এক হাজার ৩১৩টি মামলা নথিভুক্ত এবং দুই হাজার সাতজন গ্রেপ্তার হওয়ার তথ্য দেখায় যে সমস্যা শুধু সীমান্তে আটকে নেই। তাই শুধু ‘সীমান্ত বন্ধ করে দিই’—এটি সমাধান নয়। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি চাহিদা কমানো, চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানো, পুনর্বাসন, স্কুল–কলেজ পর্যায়ে প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি এবং স্থানীয় পর্যায়ে পুনঃসামাজিকীকরণের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। মাদকের প্রভাব : অপরাধের বাইরের সামাজিক সংকট মাদকের প্রভাব শুধু ব্যবহারকারীর শরীরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এতে পরিবারের আয় কমতে পারে, পারিবারিক সহিংসতা ও সামাজিক চাপ বাড়তে পারে, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান থেকে তরুণদের দূরে সরিয়ে দিতে পারে এবং অপরাধী নেটওয়ার্কের জন্য নতুন জনশক্তি তৈরি হতে পারে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (ইউএনওডিসি)-এর মতে, বিশ্বে ২০২৩ সালে প্রায় ৩১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ আগের ১২ মাসে কোনো না কোনো মাদক ব্যবহার করেছিলেন। ওপিওয়েড বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী মাদকগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে অন্যতম এবং সরাসরি মাদক-সংক্রান্ত মৃত্যুর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের সঙ্গে যুক্ত। দক্ষিণ এশিয়ায় ওপিওয়েড ব্যবহারের অংশ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি বলে ইউএনওডিসি উল্লেখ করেছে। এশিয়ায় ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যাও বড়, যা এইচআইভি এবং হেপাটাইটিস সি-এর মতো সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়। নেপাল-সংক্রান্ত ইউএনওডিসি-র আঞ্চলিক প্রতিবেদনে ২০২০ সালের সরকারি ড্রাগ ইউজার্স সার্ভের উদ্ধৃতি দিয়ে ক্যানাবিস, ট্র্যাঙ্কুইলাইজার এবং ওপিয়েট ব্যবহারের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতির কথা বলা হয়েছিল। একই আঞ্চলিক প্রতিবেদনে ২০২১ সালে নেপালে মাদক-সংক্রান্ত মামলা বৃদ্ধি এবং হেরোইন ও আফিম উদ্ধারের পরিমাণ বাড়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল। এই তথ্যগুলো একটি বিষয় দেখায়—মাদক নিয়ন্ত্রণ শুধু পুলিশের বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, যুবনীতি, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং সংগঠিত অপরাধ নিয়ন্ত্রণের একটি যৌথ প্রশ্ন। নেপাল–ভারত উভয়ের জন্য একই চ্যালেঞ্জ ভারতের কিশনগঞ্জে ধারাবাহিকভাবে ব্রাউন সুগার উদ্ধার হচ্ছে। নেপালের ঝাপাতেও ব্রাউন হেরোইন, নিয়ন্ত্রিত ওষুধ এবং অন্যান্য মাদকসহ গ্রেপ্তারের ঘটনা বারবার ঘটছে। উভয় পাশেই গ্রেপ্তার হয়। উদ্ধার হয়। মামলা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—নেটওয়ার্ক টিকে থাকে কেন? এর উত্তর খুঁজতে ‘কুরিয়ার’ গ্রেপ্তারের চেয়ে আরও গভীরে যেতে হবে। তদন্তের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত এমন পাঁচটি ক্ষেত্র ১. টাকা কোথা থেকে আসে? মাদক ব্যবসার আর্থিক নেটওয়ার্ক উন্মোচন না করলে পাচারের মূল কাঠামো খুঁজে পাওয়া কঠিন। ২. সীমান্তপারের যোগাযোগ কার সঙ্গে? গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মোবাইল, ডিজিটাল যোগাযোগ, কল এবং আর্থিক লেনদেন থেকে নেটওয়ার্কের কাঠামো শনাক্ত করতে হবে। ৩. পুলিশের অভিযানের তথ্য কীভাবে ফাঁস হয়? বড় চালান বারবার পালিয়ে গেলে অভিযান-সংক্রান্ত তথ্য ফাঁসের দিকটি তদন্ত করা উচিত। ৪. একই ব্যক্তি/নেটওয়ার্ক বারবার কেন সামনে আসে? গ্রেপ্তার, জামিন, পুনরায় গ্রেপ্তার এবং পুনরায় ব্যবসায় ফিরে আসার চক্রের তথ্যভিত্তিক নথি তৈরি করতে হবে। ৫. ব্যবহারকারীদের শুধু অপরাধী হিসেবে দেখলে কি সমস্যা সমাধান হবে? নির্ভরশীল ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সঙ্গে যুক্ত করার নীতি না থাকলে চাহিদা কমানো কঠিন হবে। এখন শুধু ‘যৌথ অভিযান’ নয়, যৌথ তদন্ত দরকার নেপাল ও ভারতের মধ্যে সীমান্তবর্তী অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জরুরি। কিন্তু মাদক ব্যবসার পরিবর্তিত ধরন দেখে সমন্বয়ের স্তরও পরিবর্তন করতে হবে। কাঁকরভিট্টা–পানিট্যাঙ্কি, ভদ্রপুর–গলগলিয়া এবং কিশনগঞ্জ অঞ্চলকে যুক্ত করে সীমান্তপারের মাদক-তথ্য আদানপ্রদানের একটি স্থায়ী ব্যবস্থা প্রয়োজন বলে মনে হয়। এতে শুধু পুলিশ নয়—নেপাল পুলিশ, সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী, মাদক নিয়ন্ত্রণ ব্যুরো, ভারতীয় এসএসবি, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ, শুল্ক ও রাজস্ব সংস্থা, আর্থিক তদন্ত সংস্থা—এদের মধ্যে তথ্য আদানপ্রদান হতে হবে। বড় পাচারকারীদের ধরতে হলে ‘সামগ্রী বহনকারী ব্যক্তি’র চেয়ে ‘সামগ্রী পাঠানো ব্যক্তি’ পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। গলগলিয়া-কাণ্ডের প্রকৃত পরীক্ষা এখন শুরু রাকেশ কুমারের বরখাস্তকে চূড়ান্ত ফলাফল হিসেবে দেখা উচিত নয়। প্রকৃত প্রশ্ন এখন—বিভাগীয় তদন্ত কী তথ্য সামনে আনে। যদি অভিযোগ প্রমাণিত না হয়, তাহলেও তার একটি প্রকাশ্য ব্যাখ্যা প্রয়োজন। যদি অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে—নেটওয়ার্ক কোন স্তর পর্যন্ত পৌঁছেছিল, কীভাবে তথ্য ফাঁস হতো, কে আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছিল এবং সীমান্তপারের কোন কোন ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক ছিল—এসব বিষয়ও প্রকাশ্য তদন্তের অংশ হওয়া উচিত। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, যদি তদন্তে পুলিশ কর্মকর্তা ও মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে যোগসাজশ প্রমাণিত হয়, তাহলে সেটিকে শুধু একজন ব্যক্তির দুর্নীতি হিসেবে সীমাবদ্ধ করা উচিত নয়। প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কোথায় ব্যর্থ হয়েছে—এই প্রশ্নও একই সঙ্গে উঠতে হবে। সীমান্ত অপরাধীদের নয়, নাগরিকদের জীবনকে যুক্ত করা একটি রেখা হওয়া উচিত গলগলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বরখাস্ত শুধু একজন পুলিশ কর্মকর্তার ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করেনি; এটি ভারত–নেপাল সীমান্তে মাদক নিয়ন্ত্রণের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। তবে এই ঘটনাকে ভিত্তি করে সমগ্র ভারতীয় পুলিশ, নেপালি নিরাপত্তা সংস্থা বা সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীকে দোষী সাব্যস্ত করা তথ্যসম্মত হবে না। বরং এই ঘটনা দুই দেশের নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভেতরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা কতটা কার্যকর, তা যাচাই করার একটি সুযোগ। কারণ মাদক নেটওয়ার্ককে সীমান্ত ও পাসপোর্ট দিয়ে থামানো যায় না। এর প্রকৃত সীমা হলো অর্থ, যোগাযোগ, চাহিদা এবং সুরক্ষার নেটওয়ার্ক। তাই এখনকার তদন্ত শুধু—‘কত গ্রাম উদ্ধার হয়েছে?’—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। তাকে জিজ্ঞেস করতে হবে—‘কে পাঠিয়েছিল?’ ‘কে সুরক্ষা দিয়েছিল?’ ‘টাকা কোথায় গেল?’ ‘তথ্য কীভাবে ফাঁস হলো?’ ‘সীমান্তের ওপারে কে ছিল?’ ‘আর একই ভূগোলে বছরের পর বছর একই ধরনের অপরাধ কেন ঘটছে?’ এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না আসা পর্যন্ত একটি চালান উদ্ধার করা সাফল্য হতে পারে, কিন্তু মাদক নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে বিজয় নয়। গলগলিয়া থেকে কাঁকরভিট্টা, ভদ্রপুর থেকে বির্তামোড় এবং দামক পর্যন্ত বিস্তৃত এই সীমান্তবর্তী ভূগোল এখন গ্রেপ্তারের সংখ্যা নয়—নেটওয়ার্কের মানচিত্র দাবি করছে। আর সেই মানচিত্র তৈরি করার দায়িত্ব নেপাল ও ভারতের উভয় দেশের নিরাপত্তা সংস্থা, সরকার এবং নাগরিক সমাজের যৌথ দায়িত্ব।





