কলকাতা: ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের নির্বাচনী ফল চ্যালেঞ্জ করে দায়ের হওয়া মামলায় গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিল কলকাতা হাই কোর্ট। বিচারপতি গৌরাঙ্গ কান্তের এজলাস মঙ্গলবার নির্দেশ দেয়, ভবানীপুরের গণনা কেন্দ্রের সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজ, ইভিএম এবং ভিভিপ্যাট সংরক্ষণ করে রাখতে হবে। আদালতের অনুমতি ছাড়া কোনও তথ্য বা ফুটেজ মুছে ফেলা যাবে না। আগামী দু’মাস পরে মামলার পরবর্তী শুনানি হবে। শুনানিতে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল প্রার্থী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে সওয়াল করেন তৃণমূল সাংসদ তথা আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, প্রথম ১২ রাউন্ড পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায় ৭,৮০০ ভোটে এগিয়ে ছিলেন। এরপর তৃণমূলের এজেন্টদের গণনাকেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং পরবর্তী সময়ে বিজেপি প্রার্থী তথা বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিপুল ভোটে এগিয়ে যান।
পাশাপাশি মঙ্গলবার ভবানীপুরের ফলাফল সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে কল্যাণ আর্জি জানান, যাতে দ্রুত এই মামলায় নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট, দ্রুত হয় নিষ্পত্তি। এদিনের এই মামলার শুনানি শেষে ভবানীপুরের গণনার কেন্দ্রের যাবতীয় সিসিটিভি ফুটেজের সংরক্ষণের নির্দেশ দেন বিচারপতি গৌরাঙ্গ কান্ত। সঙ্গে এও জানান, সংরক্ষণ করে রাখতে হবে সমস্ত ইভিএম এবং ভিভিপ্যাট। আদালতের নির্দেশ ছাড়া কোনও তথ্য মুছে ফেলা যাবে না বলেও নির্দেশ কলকাতা হাই কোর্টের বিচাপতি। উল্লেখ্য, ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটেও নন্দীগ্রাম কেন্দ্রে মমতাকে হারান শুভেন্দু। সেই বারও নির্বাচনী ফলকে চ্যালেঞ্জ করে ইলেকশন পিটিশন দাখিল করেছিলেন মমতা। সেই মামলা এখনও বিচারধীন। এরই মধ্যে এবার ভবানীপুরের ভোটের ফলকে চ্যালেঞ্জ করে একই পথে হেঁটেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
এদিকে আদালত সূত্রে খবর, মঙ্গলবার বিচারপতি গৌরাঙ্গ কান্তের এজলাসে এই সংক্রান্ত মামলার শুনানি হয়। শুনানিতে সবপক্ষের সওয়াল-জবাব শেষে এমনটাই নির্দেশ দেন বিচারপতি গৌরাঙ্গ কান্ত। আগামী দু’মাস পর ফের এই মামলার শুনানি হবে বলেও জানান হাই বিচারপতি গৌরাঙ্গ কান্ত।
২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে ভবানীপুরে শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পরাজিত হন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রায় ১৫ হাজারের বেশি ভোটে তাঁকে হারিয়ে বাংলার নতুন মুখ্যমন্ত্রী এখন শুভেন্দু অধিকারী। সেই নির্বাচনী ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা দায়ের করেন ভবানীপুরের পরাজিত তৃণমূল প্রার্থী তথা দলের সুপ্রিমো মমতা। মঙ্গলবারে এই মামলার শুনানিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হয়ে আদালতে সওয়াল করতে গিয়ে আইনজীবী তথা তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, ১২ রাউন্ড পর্যন্ত ৭৮০০ ভোটে এগিয়েছিলেন ভবানীপুরের তৃণমূলের প্রার্থী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এরপর জোর করে তৃণমূলের কর্মী এবং এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় বাহিনী সেই কাজে বিজেপির এজেন্টদের সাহায্য কাজ করে। সূর্যনীল ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আর এক কাউণ্টিং এজেন্টকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ তোলেন কল্যাণ। তাঁর দাবি, জেনারেল অবসার্ভারকে বলেও কোনও কাজ হয়নি।
১৩ রাউন্ড থেকে অস্বাভাবিকভাবে সব বদলে যায়। সিসিটিভি ক্যামেরায় সব রেকর্ড আছে। এরপরেই বিজেপি প্রার্থী তথা রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে বিজয়ী বলে জানানো হয়। এই প্রসঙ্গে নন্দীগ্রামের ঘটনাও এদিন মামলায় তুলে ধরেন আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, একই রিটার্নিং অফিসার গত ২০২১ সালের নন্দীগ্রামের নির্বাচনের সময় ছিলেন। হঠাৎ করেই তাঁকে ভবানীপুরে নিয়ে আসা হয়। পুরো ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। শুধু তাই নয়, ওই রিটার্নিং অফিসার বর্তমানে মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরের যুগ্মসচিবের দায়িত্বে। ফলে সন্দেহের যথেষ্ট কারণ রয়েছে বলেও আদালতে সওয়াল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনজীবীর। শুনানি শেষে সঙ্গে মমতার আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আদালতে বলেন, ‘মানুষের ধারণা বদলে দিন। অনেকেই মনে করেন এই ধরনের মামলার নিষ্পত্তি হয় না। সেই ধারণা বদলে দিন। দ্রুত নির্দেশ দিন।’
এর পাশাপাশি এদিন আদালতে মুখ্যমন্ত্রীর উপদেষ্টা সুব্রত গুপ্তের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে কল্যাণ বলেন, ‘বিধানসভা ভোটে কমিশন তাঁকে বিশেষ পর্যবেক্ষক করেছিল। শুধু তা-ই নয়, এসআইআর পর্বেও পর্যবেক্ষক ছিলেন তিনি। তাঁর পর্যবেক্ষণে ভবানীপুর বিধানসভায় ৪৪ হাজারের বেশি নাম বাদ গিয়েছে। আমার মক্কেল ১৩ হাজার ভোটে হেরেছে।’
এদিকে মঙ্গলবারের শুনানির শুরুর আগে বিচারপতি কান্ত মামলাকারীর উদ্দেশে বলেন, ‘মামলার মেরিট বা শুনানিতে যাওয়ার আগে আমি একটা বিষয় স্পষ্ট করতে চাই। আমার দাদা বিজেপির সর্বভারতীয় মুখপাত্র। এ নিয়ে পরে যাতে কোনও সমস্যা না-হয়, তাই জানিয়ে রাখলাম। এতে কোনও সমস্যা আছে কী?’ বিচারপতি এই প্রসঙ্গে এও বলেন, ‘এই বিষয়টি জানানো আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আমি নিজের কর্তব্যবোধ থেকেই বলছি।’বিচারপতির কথা শুনে কল্যাণ জানান, বিচারপতির প্রতি তাঁর পূর্ণ আস্থা রয়েছে। কল্যাণের কথায়, ‘বিচারব্যবস্থার উপর আমার আস্থা এবং শ্রদ্ধা রয়েছে। আমরা আপনার কোর্টে মামলা করেছি। কখনও হেরেওছি। আপনি অত্যন্ত ভদ্র মানুষ। এই পেশায় থেকে এক জন বিচারপতির প্রতি অবিশ্বাস করা আমার জন্য বিপদের।’ কল্যাণের মন্তব্যের পর মামলা শুরুর কথা জানান বিচারপতি কান্ত। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, পরপর দু’বার ভোটের ফলে পরাজিত হয়েও হার মানতে নারাজ মমতা। দুটি ক্ষেত্রেই বিরোধী একজনই, সেই শুভেন্দু অধিকারী। একুশের বিধানসভা ভোটে নন্দীগ্রামের ভোটে জয়ী হয়ে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা হয়েছিলেন শুভেন্দু। এবার মাস্টারস্ট্রোক দিয়ে নন্দীগ্রামের সঙ্গে ভবানীপুরেও ব্যাপক ব্যবধানে জয়ের পরেও ভোটের ফলে কারচুপির অভিযোগ তুলেছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী।










