গঙ্গা: আধ্যাত্মিকতার প্রতীক নাকি দূষণের শিকার এক জলধারা?

388975-ganga-pollution-image-live-law

সাধারণ মানুষের অসচেতনতায় বাড়ছে জলদূষণ

‎কলকাতা(বেবি চক্রবর্ত্তী): হিমালয়ের শুভ্র শিখরে, যেখানে মেঘ পাহাড়ের বুকে মাথা রেখে নিদ্রামগ্ন হয়, সেখানেই লুকিয়ে আছে এক নিঃশব্দ জন্মের কাহিনি। বরফগলা জলের প্রথম স্রোতধারা থেকেই জন্ম নেয় পুণ্যতোয়া গঙ্গা। গোমুখ হিমবাহের অন্তঃস্থল থেকে ঝরে পড়া সেই জলধারা যেন প্রকৃতির এক পবিত্র প্রার্থনা, যা ক্রমে মহাকাব্যের রূপ ধারণ করে।
‎গোমুখ থেকে নেমে আসা ভগীরথীর স্রোত পাথর ভেঙে, উপত্যকা অতিক্রম করে অনন্তের পথে এগিয়ে চলে। তার সঙ্গে মিলিত হয় অলকানন্দা, আর দেবপ্রয়াগের পবিত্র সঙ্গমে জন্ম নেয় ‘গঙ্গা’—যা কেবল একটি নদীর নাম নয়, বরং চিরন্তন বিশ্বাসের প্রতীক।

হিমালয়ের কোলে বেড়ে ওঠা গঙ্গা যখন সমতলে নামে, তখন সে আর শুধু নদী থাকে না, সে হয়ে ওঠে জনজীবনের প্রাণধারা। তার দুই তীরে গড়ে ওঠে সভ্যতা, সংস্কৃতি, বাণিজ্য এবং আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্র। হরিদ্বারের ঘাটে ভোরের সূর্যের সঙ্গে হাজারো মানুষ পুণ্যস্নানে অংশ নেয়, আর প্রয়াগরাজের সঙ্গমে মিলিত হয় তিনটি পবিত্র নদীর ধারা।
‎এরপর আসে বারাণসী, সময়ের থেকেও প্রাচীন এক নগরী, যেখানে গঙ্গা ইতিহাসের ধারক হয়ে প্রবাহিত। সন্ধ্যায় গঙ্গার তীরে আরতির সময় প্রদীপের আলো, শঙ্খধ্বনি ও মন্ত্রোচ্চারণে সৃষ্টি হয় এক অপার্থিব পরিবেশ, যা গঙ্গার পবিত্রতার বার্তা বহন করে।
‎কিন্তু এই পবিত্রতার আড়ালে আজ লুকিয়ে রয়েছে গভীর সংকট। যে গঙ্গাকে ‘মা’ বলা হয়, সেই নদীর বুকেই জমছে অবহেলার স্তূপ। পূজার শেষে ফুল, বেলপাতা, প্লাস্টিক, প্রতিমার অংশ নির্বিচারে ফেলে দেওয়া হচ্ছে নদীতে। অনেক স্থানে পশুপাখির মৃতদেহ ভেসে উঠছে, শহরের অপরিশোধিত নিকাশি জল এসে মিশছে নদীর স্রোতে। শিল্পায়ন ও নগরায়নের চাপে গঙ্গার স্বচ্ছতা ক্রমেই নষ্ট হচ্ছে।
‎একসময়ের নির্মল ও জীবনদায়িনী এই নদীর জল আজ বহু স্থানে পানযোগ্য তো দূরের কথা, স্পর্শ করাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। পরিবেশবিদদের মতে, এই দূষণ শুধু নদীর অস্তিত্বকেই বিপন্ন করছে না, বরং সমগ্র বাস্তুতন্ত্রের উপর প্রভাব ফেলছে। মাছ, ডলফিনসহ নানা জলজ প্রাণী টিকে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত। নদীতীরবর্তী মানুষের জীবনও দূষণের কারণে বিপন্ন হয়ে পড়ছে।
‎এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। গঙ্গা পরিশোধন কর্মসূচি এবং ‘নমামি গঙ্গে’ প্রকল্পের মাধ্যমে নিকাশি শোধনাগার নির্মাণ, শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণ এবং নদীতীর সংরক্ষণের কাজ চলছে।
‎তবুও প্রশ্ন রয়ে যায়, এই উদ্যোগ যথেষ্ট কি না। বাস্তবতা বলছে, শুধু প্রকল্প নয়, প্রয়োজন মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন। যে নদীকে পূজা করা হয়, তাকে রক্ষা করাও সমান দায়িত্ব।
‎সমাজের একাংশের মতে, বিদেশে নদী বা সমুদ্রকে ‘মা’ বলা না হলেও সেখানে জলদূষণ তুলনামূলক কম। অথচ এখানে গঙ্গাকে ‘মা’ বলা হলেও সেই নদীতেই নানাবিধ বর্জ্য ফেলে দূষণ বাড়ানো হচ্ছে। গঙ্গাসাগরে মকর সংক্রান্তির সময় স্নানের পর ভক্তদের বস্ত্র বিসর্জন, পূজার সামগ্রী নিক্ষেপ—এসবও দূষণের অন্যতম কারণ।
‎বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, পূজার সামগ্রী নদীতে না ফেলে স্থলভাগে ফেলা উচিত, যাতে তা জৈবসার হিসেবে কাজে লাগে এবং জমির উর্বরতা বাড়ায়। এর ফলে জলদূষণ অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব।
‎গঙ্গা আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে তার আধ্যাত্মিক মহিমা, অন্যদিকে দূষণের অন্ধকার ছায়া। এই অবস্থায় সমাজকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, শুধু আচার-অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ থাকা হবে, নাকি বাস্তবিকভাবে নদী রক্ষায় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
‎গঙ্গা কেবল একটি নদী নয়, এটি এক জীবন্ত ইতিহাস, এক সাংস্কৃতিক বন্ধন। তাকে রক্ষা করা মানে আমাদের ঐতিহ্য, পরিচয় ও ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা।
‎তাই পুণ্যতোয়া গঙ্গার সামনে দাঁড়িয়ে নতুন করে অঙ্গীকার করার আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা—ভক্তির সঙ্গে দায়িত্ববোধ মিলিয়েই গড়ে তুলতে হবে দূষণমুক্ত গঙ্গা।

About Author

Advertisement