কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে জীবন্ত এলার্ম ঘুম ভাঙ্গানিয়া‎‎

IMG-20260328-WA0003(1)

কোলকাতা(বেবি চক্রবর্ত্তী): সময়টা ছিল উনিশ শতকের মাঝামাঝি। সেই সময় ব্রিটেন, ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ডে কলকারখানাগুলি গড়ে ওঠার ফলে শিল্পায়ন ক্রমবর্ধমান হলেও মানুষদের তেমন আর্থিক সচ্ছলতা ছিল না। তখন বিদ্যুৎ, প্রযুক্তি, এলার্ম ঘড়িও এতটা সহজলভ্য হয়নি। তখন প্রতিটি কলকারখানায় সময়ানুবর্তিতা বজায় রাখা খুবই কঠিন ছিল।‎কলকারখানাগুলিতে অধিক শ্রমিকের পাশাপাশি দীর্ঘ কর্মসময়েরও প্রয়োজন ছিল। সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পরেও শ্রমিকদের বেতন ছিল ন্যূনতম। কাজে আসতে দেরি হলে তাঁদের বেতন কাটা যেত, এমনকি কখনো চাকরি হারানোর আশঙ্কাও থাকত।‎সারাদিনের পরিশ্রমের পর শ্রমিকরা কম্বলের তলায় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়তেন, ফলে সকালে সময়মতো ওঠা তাঁদের পক্ষে কঠিন হয়ে যেত। এর ফলে তাঁরা কারখানায় সময়মতো পৌঁছতে পারতেন না। এই সমস্যার সমাধানের জন্য দরকার পড়ে এলার্ম ঘড়ির।‎কিন্তু সেই সময়ে তার দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে ছিল। তখন যান্ত্রিক এলার্ম বা মোবাইল ফোনের কোনো ব্যবস্থা না থাকলেও ছিল ‘জীবন্ত এলার্ম’। প্রশ্ন উঠতে পারে, ‘জীবন্ত এলার্ম’ কী? আসলে এই জীবন্ত এলার্মই ছিল মানুষ—যাঁদের কাজ ছিল ভোরবেলায় অন্যদের ঘুম থেকে ডেকে তোলা।‎শিল্প বিপ্লবের সময়ে এই ঘুম ভাঙানিয়া পেশার উদ্ভব হয়। সাধারণত কলকারখানার শ্রমিকরাই খুব ভোরে ওঠার জন্য এদের নিয়োগ করতেন। এরা পরিচিত ছিলেন ‘নকার আপার্স’ নামে। ভোরের আবছা আলোয়, যখন সবাই গভীর ঘুমে, তখন এরা দরজায় ঠকঠক করে, টোকা মেরে কিংবা সাইরেন বাজিয়ে ঘুম ভাঙাতেন। এতে অনেকেই বিরক্ত হয়ে জানালা দিয়ে গালিগালাজ করতেন। কিন্তু সেটাই ছিল তাঁদের পেশা।‎প্রথমদিকে এরা দরজায় ধাক্কা দিয়ে বা সামনে দাঁড়িয়ে বলতেন, “উঠে পড়ো সাহেব, ভোর হয়ে গেছে…।” এতে অন্যদেরও ঘুম ভেঙে যেত, ফলে তাঁদের মজুরি কাটা পড়ত। একজন নকার আপার্সকে গড়ে ৩৫ থেকে ১০০ জন মানুষকে জাগাতে হত। এই সমস্যা এড়াতে তাঁরা ‘স্নাফার আউটার’ নামে একটি সরঞ্জাম ব্যবহার করতেন, যা মূলত গ্যাসের বাতি নেভানোর কাজে ব্যবহৃত হত। সাধারণত স্বল্প পারিশ্রমিকে বয়স্ক পুরুষ, পুলিশ কনস্টেবল এবং গর্ভবতী মহিলারাও এই পেশায় যুক্ত ছিলেন।‎প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়েও ভোরবেলায় রাস্তায় ঘুম ভাঙানিয়াদের দেখা যেত। কারো হাতে থাকত লম্বা লাঠি, কারো হাতে হাতুড়ি। কখনো সরু ফাঁপা লাঠিতে ছোট দানা ভরে জানালায় ছুঁড়ে, আবার কখনো লাঠি দিয়ে টোকা মেরে ঘুম ভাঙাতেন তাঁরা। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—যাঁদের কাজ অন্যদের জাগানো, তাঁরা নিজেরা এত ভোরে কীভাবে উঠতেন?‎আসলে তাঁদের বিশ্রামের ধরণ ছিল ভিন্ন। অনেক সময় সারারাত জেগেই কাটাতেন তাঁরা, যাতে নির্দিষ্ট সময়ে উঠতে পারেন। ভোরে কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরে দিনের বেলা ঘুমাতেন। সন্ধ্যার পর আর ঘুমোতেন না, কারণ দেরি হলে নিজেরাও কাজে ব্যর্থ হতেন।‎প্রচণ্ড ঠান্ডা উপেক্ষা করে, সামান্য অর্থের বিনিময়ে কাজ করেও তাঁদের কপালে জুটত অবহেলা, গালিগালাজ, এমনকি কখনো তাঁদের গায়ে জল ছুঁড়ে দেওয়া হত। নিয়োগকারীদের কাছ থেকেও তেমন কৃতজ্ঞতা পেতেন না তাঁরা।‎আজ আমরা সময়কে হাতের মুঠোয় এনেছি, কিন্তু ভুলে গেছি সেই সময়কে, যখন মানুষকেই এলার্ম হিসেবে ব্যবহার করতে হত। তাই এই পেশা একসময় বিলুপ্তির পথে গেলেও ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত উত্তর ইংল্যান্ডের কিছু শহরে এই পেশা টিকে ছিল। কিন্তু আধুনিকতার সঙ্গে সঙ্গে আমরা ভুলে গেছি সেই নীরব কর্মীদের কথা, যারা বছরের পর বছর রাত জেগে অন্যদের জাগিয়ে তুলেছেন।‎সময়ের স্রোতে তারা আজ হারিয়ে গেছে। যেমন হারিয়ে গেছে ঘুম পাড়ানি গান, তেমনি হারিয়ে গেছে ঘুম ভাঙানিয়াদের কণ্ঠস্বর। তবে সময়কে যদি পিছনে ফেরানো যেত, ভোরের আলোয় হয়তো এখনও শোনা যেত সেই ডাক—“উঠে পড়ো সাহেব, ভোর হয়ে গেছে…।”

About Author

Advertisement