বাঙালির জাহাজ ব্যাবসার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে ‘সরোজিনী’

IMG-20260207-WA0102

কোলকাতা(বেবি চক্রবর্ত্তী): ব্রিটিশ আমলে বাঙালিরা জাহাজ ব্যাবসায় ছিল অধিক প্রভাবশালী। বিংশ শতকের গোড়ার দিকে যখন সমগ্র ভারতবাসী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের শৃঙ্খলে আবদ্ধ, তখন অর্থনৈতিক দিক থেকেও উপনিবেশিক পরাধীনতা ভয়ানক রূপ নিয়েছিল। ঠিক সেই সময় বাঙালির উদ্যমে আত্মপ্রকাশ ঘটে স্বদেশি শিল্প ও বাণিজ্য আন্দোলনের।
এরই ধারাবাহিকতায় কলকাতা থেকে পরিচালিত ‘স্বদেশী স্টিম নেভিগেশন কোম্পানি’র অধীনে চালু হয় একটি স্বদেশি জাহাজ ’সরোজিনী’। এই জাহাজের নামকরণ হয় ভারতের প্রথম মহিলা কংগ্রেস নেত্রী ও কবি সরোজিনী নাইডুর নাম অনুসারে। এটি ছিল এক প্রতীকী পদক্ষেপ—নারীশক্তি, দেশপ্রেম ও আত্মনির্ভরতার সম্মিলিত রূপ।সেই সময় জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের জাহাজের নাম ছিল ‘সরোজিনী’।
এই জাহাজের জনপ্রিয়তা যত বাড়তে থাকে ততই ব্রিটিশ শাসকের অস্বস্তি বাড়তে থাকে। তিনি ১৮৮৪ সালে খুলনা থেকে বরিশাল যাত্রী পরিবহনের জন্য ‘সরোজিনী’ নামের এই জাহাজটি চালু করেন। তিনি একজন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। যিনি একাধারে সঙ্গীত, নাটক এবং চিত্রকলার ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন। ১৮৬৮ সালে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সাথে কাদম্বরীর বিবাহ হয়। কাদম্বরী দেবী রবীন্দ্রনাথকে বিভিন্ন গল্প, কবিতা, নাটক এবং গান রচনায় উৎসাহ জুগিয়েছেন।
অন্যদিকে এই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের সহধর্মিনী ছিলেন কাদম্বরী দেবী। তিনি হলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্রবধূ এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বৌঠান। তিনি ছিলেন ঠাকুরবাড়ির বাজার সরকার শ্যাম গাঙ্গুলির তৃতীয় কন্যা।সেদিনটা ছিল ১৮৮৪ সালের ১৯ এপ্রিল – বিলিতি জাহাজ কোম্পানি ফ্লোটিলার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে খুলনা-বরিশাল জলপথে ফেরি চালালেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ বুঝতে পারেননি, ওটাই হয়ে উঠবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার দিন।জাহাজের উদ্বোধনের কোনও কর্মকাণ্ডে স্ত্রী কাদম্বরীকে জড়াননি জ্যোতিরিন্দ্রনাথ।
বলেছেন, একেবারে উদ্বোধনের দিন জাহাজে নিয়ে গিয়ে চমকে দেবেন।কাদম্বরী প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বিশু তাঁতিনিকে ডেকে নতুন একটি কমলারঙা স্বর্ণচরী শাড়িও বেছেছেন উদ্বোধনে পরার জন্য, গয়না বেছে বেছে আয়নার সামনে পরে দেখছেন। শুধু জ্যোতিই তাঁকে চমক দেবেন তা হয় না, কাদম্বরীও চমকে দেবেন জ্যোতিকে।জীবনের সেরা সাজ সাজবেন তিনি। রূপের উজ্জ্বলতা নিয়ে যখন জাহাজের ডেকে গিয়ে দাঁড়াবেন, লোকের চোখ তাঁকেই ঘুরেফিরে দেখবে। শাড়ি-গয়না নাড়াচাড়া করেন, আর অপেক্ষা করতে থাকেন ১৯-এর বিকালের জন্য। জাহাজে তখন শেষমুহুর্তের চাপ।
একদিকে প্রবল কর্মযজ্ঞ আর অন্যদিকে অনন্ত প্রতীক্ষা।এরপর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিবাহের চার মাস পরে ১৯ এপ্রিল, ১৮৮৪ সালে কাদম্বরী দেবী আফিম খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন‌ এবং তার দুই দিন পর ২১ এপ্রিলে তিনি মাত্র ২৪ বছর বয়সে মারা যান।জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার এই আত্মহত্যার বিষয়ে নীরব ছিল।তাঁর আত্মহত্যার কারণ নিয়ে বিভিন্ন কৌতুহলি ধোঁয়াশা প্রচলিত আছে। তবে সঠিক কারণ আজও অস্পষ্ট। ঠাকুর পরিবারের নীরবতা এই ঘটনাটিকে জনসমক্ষে আনতে নীরব ছিল।
কাদম্বরী দেবীর মৃত্যুর পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল এবং এটি তাঁর সাহিত্যকর্মেও প্রতিফলিত হয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর পর জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর সমাজ ও সংসার থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন এবং প্রায় সন্ন্যাসীর জীবন যাপন করেছিলেন।রামদুলাল দে ছিলেন এই সময়ের একজন বিখ্যাত বাঙালি জাহাজ ব্যাবসায়ী যিনি কলকাতা থেকে আমেরিকা ও ইউরোপে জাহাজ চালাতেন। এবার মদনমোহন দত্তের মতো ব্যাবসায়ীরাও জাহাজ ব্যাবসার সাথে যুক্ত ছিলেন। পাশাপাশি তাঁরা ব্রিটিশ জাহাজ কোম্পানির সাথে প্রতিযোগিতা করতেন।
আর মতিলাল ছিলেন উত্তর কলকাতার একজন বিখ্যাত বাঙালি ব্যাবসায়ী। যিনি প্রথম বাষ্পীয় জাহাজ ব্যবহার করেন।সেই সময় ‘সরোজিনী’ জাহাজটি চালু হয়েছিল মূলত ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ স্বরূপ। এই জাহাজ কলকাতা থেকে চট্টগ্রাম, বরিশাল, ও খেপুপাড়া পর্যন্ত বাণিজ্যিক যাত্রী ও মালামাল পরিবহন শুরু করে। এর মাধ্যমে বাঙালির নিজের জলপথে স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।এই সময়ে ব্রিটিশ বাণিজ্যিক সংস্থাগুলো, বিশেষ করে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান স্টিম নেভিগেশন কোম্পানি, ‘সরোজিনী’কে থামাতে নানা চক্রান্ত করে। কিন্তু জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনে এই জাহাজ এক প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠে।
বহু মানুষ ইচ্ছে করেই ব্রিটিশ জাহাজ পরিহার করে ‘সরোজিনী’তে যাতায়াত করতেন।নানা প্রশাসনিক কৌশলে এই কোম্পানিকে আর্থিকভাবে ধ্বংস করার চেষ্টা চলে। কিছুদিন পর লোকসানের মুখে পরে জাহাজটি বন্ধ হয়ে যায়। তবে ‘সরোজিনী’র পতন সাময়িক হলেও এর গৌরব অম্লান। এটি প্রমাণ করে দেয়, বাঙালি কেবল ভোক্তা জাতি নয়—সাহস ও সংকল্প থাকলে বাঙালিও সমুদ্রপথে বাণিজ্য করতে পারে।সরোজিনী’র ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয় যে বাঙালি জাতি যুগে যুগে প্রতিকূলতাকে জয় করে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে।
এটি ছিল জাতীয়তাবাদের অনুশীলন মঞ্চ। আজও যখন আমরা নিজেদের শিল্প ও প্রযুক্তিতে আত্মনির্ভর হওয়ার কথা বলি, তখন ‘সরোজিনী’র কথা স্মরণ না করে পারা যায় না।সরোজিনী’ কেবল একটি জাহাজ নয় এ এক প্রেরণা এবং ঐতিহ্য। বাঙালির ইতিহাসে এই নাম থাকবে স্বর্ণাক্ষরে লেখা। ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে একটি উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে থাকবে যা তাঁদের আত্মবিশ্বাস ও আত্ম-নির্ভরতার পথ দেখাবে। ‘স্বদেশি স্টিমারের বাষ্পে উড়ছিল জাতির আত্মবিশ্বাস—‘সরোজিনী’ ছিল সেই বাষ্পযানের হৃদয়’। তাই শিবনাথ শাস্ত্রীর কথায় বলা যায় ‘সরোজিনী হারিয়ে যায়, কিন্তু ইতিহাসে থেকে যায় তার কণ্ঠস্বরে বলা ‘আমি বাঙালি, আমি পারি’।

About Author

Advertisement