বেবি চক্রবর্তী
ভাষা আমাদের অমূল্য সম্পদ। শব্দ আমাদের অলংকার। শিক্ষা জ্ঞানের সঞ্চিত ভাণ্ডার—অন্ধকারে জ্বলে ওঠা প্রদীপের মতো। ভাষা মানুষকে শুধু কথা বলার ক্ষমতা দেয় না, ভাষাই মানুষকে মানুষ করে তোলে। মানুষ তার অস্তিত্ব, চেতনা, স্মৃতি, অনুভূতি ও আত্মপরিচয় ভাষার মাধ্যমেই প্রকাশ করে। ভাষা ছাড়া চিন্তার রূপ নেই, অনুভূতির প্রকাশ নেই, ইতিহাসের ধারাবাহিকতাও থাকে না। ব্যক্তিত্বের জাগরণের মতোই একটি জাতির বিকাশও ভাষাকেন্দ্রিক। আমাদের শৈশবের ঘুম মাতৃভাষার ছন্দে নামে, রাতের নিস্তব্ধতা মাতৃভাষার স্নেহে পূর্ণ হয়, আর সকালের আলোও সেই কোমল উচ্চারণের সঙ্গেই উদিত হয়। তাই মাতৃভাষা কেবল উচ্চারণের বিষয় নয়, এটি অস্তিত্বের ভিত্তি।
এই কারণেই ২১ ফেব্রুয়ারি বাঙালির কাছে শুধুমাত্র একটি তারিখ নয়, আবেগে ভরা ইতিহাস। মাতৃভাষার অধিকারের জন্য দেওয়া আত্মবলিদান আজও আমাদের চেতনায় উজ্জ্বল। বিশ্বের সব জাতির মাতৃভাষার অধিকার ও মর্যাদাকে স্মরণ করার দিন হিসেবে আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হয়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এপার বাংলায় এই দিবসের উদ্যাপন কতটা বাস্তব, কতটা আন্তরিক এবং কতটা কার্যকর?
বাস্তব চিত্র খুব উৎসাহজনক নয়। বাণিজ্য, শিক্ষা ও প্রশাসনের বহু ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা এখনও উপেক্ষিত। বিশ্বায়নের যুগে ইংরেজির আন্তর্জাতিক প্রভাব স্বীকার করতেই হয়। কিন্তু চীনা, জাপানি, কোরিয়ান, থাই, তামিল, তেলুগু বা হিন্দিভাষী সমাজ নিজেদের মাতৃভাষাকে সমান গুরুত্ব দিয়েই এগিয়ে চলেছে। তারা বিশ্বসঙ্গে সংযোগ রেখে মাতৃভাষার বিকাশেও মনোযোগ দিয়েছে। অথচ আমাদের শিক্ষিত সমাজের বড় অংশ ইংরেজিকে বাংলার চেয়ে উচ্চস্থানে রাখে। সাহিত্য–সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত মানুষও ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট। ফলে বাংলা ভাষা ক্রমশ প্রান্তে সরে যাচ্ছে। ভাষা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় গভীর সচেতনতা তথাকথিত সচেতন সমাজেই দুর্লভ।
২১ ফেব্রুয়ারিতে শহীদ বেদি ফুলে ভরে যায়, আবেগঘন ভাষণে মঞ্চ মুখরিত হয়। কিন্তু বছরের বাকি দিনগুলোতে সেই ভাষাপ্রেম কোথায় হারিয়ে যায়? উপরিভাগের আবেগ আনুষ্ঠানিকতা পূরণ করে, কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে বাংলার ব্যবহার সীমিত হতে থাকে। তবুও বাংলা সম্পূর্ণ আত্মবিস্মৃত হয়নি। বরাক উপত্যকার ‘উনিশ’ এবং কাঁটাতারের ওপারের ‘একুশ’, এই দুই ইতিহাস এখনও ভাষার সেতুবন্ধন রক্ষা করে চলেছে।
বিশ্বপরিপ্রেক্ষিতে ভাষার সংকট আরও গভীর। বিশ্বে প্রায় ছয় হাজার ভাষা প্রচলিত, যার অর্ধেকই বিলুপ্তির পথে। বিশ্বায়নের চাপে বহু ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবেশী অসমেও প্রায় প্রতিদিন কোনও না কোনও ভাষা সংকটে পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে মাতৃভাষার সংরক্ষণ কতটা সম্ভব—এই প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে।
ভাষা ও সংস্কৃতি অবিচ্ছেদ্য। মাতৃভাষাতেই সংস্কৃতি বিকশিত হয়। ভাষা হারালে সংস্কৃতিও দুর্বল হয়ে পড়ে। বৈচিত্র্যের সম্মান থেকেই বিশ্বসংস্কৃতির নির্মাণ সম্ভব। কিন্তু বাজারকেন্দ্রিক বিশ্বায়ন সংস্কৃতিহীনতার এক পরিবেশ তৈরি করছে। মুনাফাকেন্দ্রিক এই প্রক্রিয়া শুধু ছোট ভাষাকেই নয়, প্রভাবশালী ভাষাকেও ভিন্নভাবে প্রভাবিত করছে। তাই যে কোনও ভাষা–সংস্কৃতি রক্ষায় প্রয়োজন সচেতন প্রতিরোধ ও আত্মমর্যাদা।
আজ ২১ ফেব্রুয়ারি শুধু বাঙালির অধিকারের দিন নয়, এটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এটি আত্মপরিচয়ের সংগ্রামের প্রতীক, বিশ্বের সব ভাষার মর্যাদার দিন। এটি কোনও রাষ্ট্রবিরোধী আন্দোলন নয়, বরং নিজের ভাষাকে রক্ষা করার আন্দোলন।
তবে এপার বাংলার সামাজিক বাস্তবতা ভিন্ন ছবি তুলে ধরে। জীবিকা ও অর্থনীতিতে ইংরেজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। বিনোদন ও সংস্কৃতিতে হিন্দির প্রভাবও স্পষ্ট। ফলে বাংলার সামাজিক গুরুত্ব কমে যাচ্ছে। বাংলা অর্থনীতির ভাষা নয়, সর্বভারতীয় যোগাযোগের ভাষা নয়, অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার প্রধান ভাষাও নয়, এই ধারণা ক্রমেই গভীর হচ্ছে। তাই অনেকেই মনে করেন, সফল হতে ইংরেজিই অপরিহার্য; বাংলা আঁকড়ে ধরে এগোনো যায় না।
এই প্রেক্ষাপটে কারও কারও কাছে ‘একুশ’ অপ্রাসঙ্গিক বলে মনে হচ্ছে। মাতৃভাষাকে উপেক্ষা করে বিদেশি ভাষার পিছনে ছুটে চলাকেই যখন প্রগতির চিহ্ন মনে করা হয়, তখন একুশের চেতনা কতটা কার্যকর থাকে? অনেকের কাছে এটি কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখে পরিণত হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির জগতে বাংলার স্থান নেই, এই ধারণাও শক্তিশালী হচ্ছে। তাই ১৯৫২-এর একুশ হোক বা আজকের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, কাঁটাতারের এপারের বাংলার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
কিন্তু এই উদ্বেগই একুশের মূল প্রশ্নকে সামনে আনে। ভাষা হারালে আত্মপরিচয় হারায়, আত্মপরিচয় হারালে জাতির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তাই একুশের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে যত বিতর্কই হোক না কেন, একুশের প্রশ্ন আজও জীবন্ত, এপার বাংলার বিবেককে নাড়া দিয়ে যাওয়া এক জীবন্ত প্রশ্ন।









