মমতার মন্দিরাভিযান: ভক্তি না ভোটের অঙ্ক?

5130356-ani-20260101054629

উত্তরবঙ্গের নতুন ‘মহাকাল’ এবং রাজনীতির বাঁক

কলকাতা: শীতের কুয়াশামোড়া শিলিগুড়ির আকাশ যখন জানুয়ারির মিঠে রোদ গায়ে মাখছে, ঠিক তখনই এক নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ দানা বাঁধছে মহানন্দার পাড়ে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘোষণা অনুযায়ী, ২০২৬-এর জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহেই শিলিগুড়িতে নবনির্মিত ‘মহাকাল মন্দির’-এর উদ্বোধন হতে চলেছে। দার্জিলিংয়ের পাহাড়ে মহাকাল মন্দিরে পুজো দেওয়ার সময় যে পরিকল্পনার বীজ মুখ্যমন্ত্রী বুনেছিলেন, তা এখন শিলিগুড়ির মাটিতে মূর্ত হচ্ছে। ২৫ একরের সুবিশাল জমি, সর্বোচ্চ চূড়া আর আধুনিক সুযোগসুবিধা সম্পন্ন এই মন্দির কেবল ভক্তদের জন্য নয়, বরং উত্তরবঙ্গের মানুষের ‘নাড়ির টান’ বুঝে নেওয়ার এক সুকৌশলী চাল।
দীর্ঘ এক দশক ধরে উত্তরবঙ্গের আটটি জেলায় বিজেপির যে আধিপত্য দেখা গিয়েছে, তার মূলে ছিল হিন্দুত্বের মেরুকরণ আর ‘বঞ্চিত’ পরিচিতি সত্তার রাজনীতি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন সেই আবেগকেই নিজের ঝোলায় পুরতে চাইছেন। শিলিগুড়ির মহাকাল মন্দির বা কোচবিহারের মদনমোহন মন্দিরের আধুনিকীকরণ— এসবই আসলে বিজেপির ‘রাম’ ইমেজের বিপরীতে বাংলার নিজস্ব ‘শিব’ বা ‘বিষ্ণু’ সংস্কৃতিকে হাতিয়ার করার প্রচেষ্টা।
দিঘা থেকে কালীঘাট, ‘টেম্পল ট্যুরিজম’:
মমতার এই মন্দিরাভিযান কেবল উত্তরবঙ্গেই সীমাবদ্ধ নেই। ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল দিঘায় যে জগন্নাথ মন্দিরের উদ্বোধন মুখ্যমন্ত্রী করেছিলেন, তা এক ঐতিহাসিক রেকর্ড তৈরি করেছে। মাত্র আট মাসের মধ্যে সেখানে ১ কোটি ভক্তের সমাগম ঘটেছে। ২৫০ কোটি টাকার এই প্রকল্পটি কেবল ওডিশার পুরীর ধাঁচে তৈরি স্থাপত্য নয়, এটি বাঙালির ভক্তির এক নতুন ঠিকানাকে রাজনৈতিক স্বীকৃতি দেওয়া।
একই সুর শোনা যায় কালীঘাটে। বহু টালবাহানার পর ২০২৫-এর এপ্রিলে নববর্ষের উপহার হিসেবে যখন ৯৫ কোটি টাকার কালীঘাট স্কাইওয়াক জনগণের জন্য খুলে দেওয়া হল, তখন বোঝা গেল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরিকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে ধর্মকে জুড়ে দিতে কতটা সফল। এরপর এসেছে কলকাতা নিউটাউনের ‘দুর্গা অঙ্গন’। গত ডিসেম্বর মাসেই মুখ্যমন্ত্রী ১৭ একর জমির ওপর এই সুবিশাল সাংস্কৃতিক প্রকল্পের শিলান্যাস করেছেন। অর্থাৎ, দিঘার জগন্নাথ, কালীঘাটের কালী আর রাজারহাটের দুর্গা— এই ‘ত্রিকোণ’ সমীকরণে মমতা এখন বাংলার আধ্যাত্মিক আইকন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছেন।
ভক্তি নাকি বাধ্যবাধকতা? বিবর্তনের পথরেখা:
তৃণমূলের এই নরম হিন্দুত্বের পথে হাঁটা কিন্তু এক দিনে হয়নি। ২০১১ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত তৃণমূলের গায়ে যে ‘সংখ্যালঘু তোষণ’-এর তকমা সেঁটে দিয়েছিল বিজেপি, ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে তার ফল হাতেনাতে পাওয়া গিয়েছিল। ১৮টি আসন বিজেপির দখলে যাওয়ার পর তৃণমূলের থিংকট্যাংক বা ‘আইপ্যাক’ বুঝেছিল যে, কেবল উন্নয়ন দিয়ে হিন্দু ভোটব্যাংক ধরে রাখা সম্ভব নয়।
এর পর থেকেই শুরু হল বদল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সভার শুরুতেই ‘চণ্ডীপাঠ’ করা শুরু করলেন। পুরোহিত ভাতা চালু হল। সবচেয়ে বড় চমক ছিল দুর্গাপুজোর অনুদান। ২০২৫ সালে রাজ্য সরকার প্রতিটি পুজো কমিটিকে ১.১ লক্ষ টাকা করে অনুদান দিয়েছে, যার মোট খরচ প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। এই বিশাল পরিমাণ অর্থ যখন সরকারি কোষাগার থেকে খরচ হয়, তখন তা আর কেবল সংস্কৃতি থাকে না, তা হয়ে ওঠে ‘সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ’-এর পালটা লড়াই। বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবকে ইউনেসকোর স্বীকৃতি এনে দেওয়া থেকে শুরু করে রেড রোডে পুজো কার্নিভাল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমাণ করেছেন যে হিন্দু ধর্মকে উৎসবের মোড়কে জনমোহিনী করে তোলার কৌশল তিনি বিজেপির চেয়ে ভালো জানেন।
প্রশ্ন উঠতে পারে, মমতা কি তবে আরএসএস-এর বেঁধে দেওয়া পিচেই খেলতে শুরু করেছেন? রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এটি মোটেও আত্মসমর্পণ নয়, বরং এক ‘কাউন্টার-স্ট্র্যাটেজি’। বিজেপি যেখানে রাম মন্দিরের মাধ্যমে এক দেশ, এক ধর্ম ও এক জাতীয়তাবাদের কথা বলে, মমতা সেখানে ‘বাংলার ঘরোয়া ভগবান’দের নিয়ে আসছেন। তিনি সুকৌশলে জগন্নাথ, শিব বা কালীকে বাঙালির নিজস্ব পরিচিতির সঙ্গে জুড়ে দিচ্ছেন।
এর ফলে বিজেপি যখন তৃণমূলকে ‘হিন্দু-বিরোধী’ বলে আক্রমণ করতে যায়, তখন দিঘার মন্দির বা শিলিগুড়ির মহাকাল মন্দির সেই আক্রমণকে ভোঁতা করে দেয়। মমতার যুক্তি খুব পরিষ্কার— ‘আমি সব ধর্মের সঙ্গে আছি, কিন্তু হিন্দু হিসেবে আমার নিজস্ব আবেগ আছে।’ এই ভারসাম্যের রাজনীতির মাধ্যমে তিনি একাধারে যেমন হিন্দু ভোটব্যাংককে আশ্বস্ত করছেন, তেমনই বিজেপির মেরুকরণের পালে হাওয়া কাড়ছেন।
সংখ্যালঘুদের সংশয় ও তৃণমূলের অস্বস্তি:
তবে মুদ্রার উলটো পিঠও আছে। মমতার এই মন্দির রাজনীতির ফলে তৃণমূলের দীর্ঘদিনের অটুট সংখ্যালঘু ভোটব্যাংকে চোরা ফাটল দেখা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ২০২৫-এর শেষে মুর্শিদাবাদের বেলডাঙ্গায় তৃণমূলের বহিষ্কৃত বিধায়ক হুমায়ুন কবীর যখন ‘বাবরি মসজিদ’-এর ধাঁচে এক বিশাল মসজিদ তৈরির শিলান্যাস করলেন, তখন তা ছিল মমতার মন্দির রাজনীতির এক পরোক্ষ প্রতিবাদ।
সংখ্যালঘু নেতৃত্বের একাংশ মনে করছেন, সরকার যদি ২৫০ কোটি টাকা খরচ করে মন্দির তৈরি করতে পারে, তবে মাদ্রাসা বা ওয়াকফ সম্পত্তির উন্নয়নের জন্য কেন আরও বেশি বরাদ্দ হবে না? এই অসন্তোষকে পুঁজি করে আইএসএফ বা নতুন ছোট ছোট দলগুলো যদি মুসলিম ভোটব্যাংকে থাবা বসায়, তবে ২০২৬-এর লড়াই তৃণমূলের জন্য কঠিন হতে পারে। ২০২৫-এর এপ্রিলে মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জে যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল, তা এই পরিবর্তিত রাজনৈতিক সমীকরণেরই এক বিপজ্জনক বহিঃপ্রকাশ।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় খুব সফলভাবে ধর্মের সঙ্গে ‘পর্যটন’ এবং ‘অর্থনীতি’কে মিশিয়ে দিয়েছেন। দিঘা বা গঙ্গাসাগরের মেগা প্রোজেক্টগুলো কেবল মন্দির নয়, সেখানে হোটেল ব্যবসা, পর্যটনশিল্প আর স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। দিঘা আজ কেবল সমুদ্র দেখার জায়গা নয়, জগন্নাথ দর্শনের ‘পিলগ্রিমেজ ট্যুরিজম’ হাব। এই মডেলটি তিনি এখন উত্তরবঙ্গেও প্রয়োগ করছেন।

About Author

Advertisement