ভারত–নিউজিল্যান্ডের মধ্যে এফটিএ আলোচনা সম্পন্ন

INDIA-NEWZEALAND-TRADE-0_1753457534315_1753457558993

নিউজিল্যান্ডের ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের অঙ্গীকার

নয়াদিল্লি: ভারত ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে সম্পন্ন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) অনুযায়ী, আগামী ১৫ বছরে ভারতে ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করার অঙ্গীকার করেছে নিউজিল্যান্ড। সরকারি বিবৃতির মাধ্যমে এই তথ্য জানানো হয়েছে। এই অঙ্গীকারটি চলতি বছরের অক্টোবরে ভারতের সঙ্গে চারটি ইউরোপীয় দেশের জোট ইএফটিএ (ইউরোপীয় মুক্ত বাণিজ্য সংস্থা)–র সঙ্গে স্বাক্ষরিত অনুরূপ বাণিজ্য চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ওই চুক্তির আওতায় ইএফটিএ ১৫ বছরে ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
প্রসঙ্গত, সোমবার ভারত ও নিউজিল্যান্ড মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির জন্য আলোচনা সম্পন্ন হওয়ার ঘোষণা দেয়। এই চুক্তির ফলে বস্ত্র, জুতো, ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্যসহ বিভিন্ন দেশীয় পণ্য নিউজিল্যান্ডের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে।
তবে ভারত দুগ্ধ (ডেয়ারি) খাতে কোনো ধরনের শুল্কছাড় দেয়নি, যা নিউজিল্যান্ডের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল। চুক্তিটি আগামী তিন মাসের মধ্যে স্বাক্ষরিত হওয়ার এবং পরের বছর থেকে কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, নিউজিল্যান্ড আগামী ১৫ বছরে ভারতে ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগকে সহায়তা করার অঙ্গীকার করেছে।
বাণিজ্য মন্ত্রক জানিয়েছে,“সব শুল্ক শ্রেণিতে শুল্ক প্রত্যাহার করা হলে ভারতের সমস্ত রপ্তানি শুল্কমুক্ত বাজারে প্রবেশাধিকার পাবে।”
ভারতীয় পরিষেবা খাতের জন্য নতুন সুযোগ:
মন্ত্রকের মতে, এই বাজার প্রবেশাধিকার বস্ত্র, পোশাক, চামড়া, জুতো, সামুদ্রিক পণ্য, রত্ন ও অলঙ্কার, হস্তশিল্প, ইঞ্জিনিয়ারিং সামগ্রী এবং মোটরগাড়ির মতো শ্রমনির্ভর খাতগুলির প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।
এছাড়াও, তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) ও আইটি-সক্ষম পরিষেবা, পেশাদার পরিষেবা, শিক্ষা, আর্থিক পরিষেবা, পর্যটন, নির্মাণ ও অন্যান্য ব্যবসায়িক পরিষেবাসহ উচ্চ-মূল্যের বহু খাতে ভারত উল্লেখযোগ্য প্রতিশ্রুতি অর্জন করেছে। এর ফলে ভারতীয় পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা ও উচ্চদক্ষ কর্মসংস্থানের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এফটিএ–এর মাধ্যমে ভারতীয় পেশাদার, শিক্ষার্থী ও যুবসমাজের জন্য প্রবেশ ও বসবাসের উন্নত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্যে পড়াশোনার সময় কাজের সুযোগ, পড়াশোনা শেষে কাজের পথ, নির্দিষ্ট ভিসা ব্যবস্থা এবং ‘ওয়ার্কিং হলিডে’ ভিসা কাঠামো অন্তর্ভুক্ত।
এছাড়া দক্ষ পেশায় কর্মরত ভারতীয়দের জন্য একটি নতুন অস্থায়ী কর্মসংস্থান প্রবেশ ভিসা পথ খোলা হয়েছে, যার আওতায় যেকোনো সময় ৫,০০০ ভিসার কোটা থাকবে এবং সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত বসবাসের সুযোগ মিলবে।
কৃষক সহায়তায় বিশেষ গুরুত্ব:
মন্ত্রকের মতে, এই চুক্তির আওতায় আয়ুষ চিকিৎসক, যোগ প্রশিক্ষক, ভারতীয় রাঁধুনি ও সঙ্গীত শিক্ষকের মতো পেশার পাশাপাশি আইটি, ইঞ্জিনিয়ারিং, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও নির্মাণের মতো উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন খাতগুলিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা শ্রমের গতিশীলতা ও পরিষেবা বাণিজ্যকে শক্তিশালী করবে।
এছাড়াও কিউই ফল, আপেল ও মধুর জন্য কৃষি-প্রযুক্তি কর্মপরিকল্পনা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি ও গবেষণা সহযোগিতা, গুণমান উন্নয়ন এবং মূল্যশৃঙ্খল উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এর লক্ষ্য দেশীয় সক্ষমতা মজবুত করা ও ভারতীয় কৃষকদের সহায়তা করা।
দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধির সম্ভাবনা:
এই সহযোগিতার মধ্যে উৎকর্ষ কেন্দ্র স্থাপন, উন্নত রোপণ উপকরণ, উৎপাদকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, বাগান ব্যবস্থাপনা, ফসল কাটার পরবর্তী প্রক্রিয়া, সরবরাহ শৃঙ্খল কর্মদক্ষতা এবং খাদ্য নিরাপত্তার জন্য প্রযুক্তিগত সহায়তা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
২০২৪–২৫ সালে দ্বিপাক্ষিক পণ্য বাণিজ্য ১.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, আর ২০২৪ সালে পণ্য ও পরিষেবার মোট বাণিজ্য প্রায় ২.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছিল। এর মধ্যে শুধুমাত্র পরিষেবা খাতের অবদান ছিল ১.২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যেখানে ভ্রমণ, আইটি ও ব্যবসায়িক পরিষেবাগুলি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। মন্ত্রক জানিয়েছে,“এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পূর্ণ সম্ভাবনা উন্মোচনের জন্য একটি স্থিতিশীল ও পূর্বানুমেয় কাঠামো প্রদান করে।”
বাণিজ্য সচিব রাজেশ আগরওয়াল জানান, আনুষ্ঠানিকভাবে মাত্র পাঁচ দফা আলোচনা হলেও চুক্তিটি সম্পন্ন করতে উভয় পক্ষই নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখেছিল।
চুক্তির প্রধান দিকগুলো:
ভারতের ১০০ শতাংশ রপ্তানির জন্য শুল্কমুক্ত বাজার প্রবেশাধিকার।
ভারত ৭০ শতাংশ শুল্ক শ্রেণিতে শুল্ক উদারীকরণের প্রস্তাব দিয়েছে, যা ভারত–নিউজিল্যান্ড দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ৯৫ শতাংশকে অন্তর্ভুক্ত করে।
বস্ত্র, পোশাক, চামড়া, জুতো, সামুদ্রিক পণ্য, রত্ন–অলঙ্কার, হস্তশিল্প, ইঞ্জিনিয়ারিং সামগ্রী ও মোটরগাড়ির মতো শ্রমনির্ভর খাতগুলির প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি।
উন্নত দেশের সঙ্গে দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন এই এফটিএ বস্ত্র, ওষুধ, চামড়া, ইঞ্জিনিয়ারিং ও কৃষিপণ্যসহ সমস্ত ভারতীয় রপ্তানির জন্য বছরের এক উল্লেখযোগ্য সাফল্য।
৫,০০০ পেশাদারের জন্য অস্থায়ী কর্মসংস্থান ভিসা এবং ১,০০০ কর্ম ও অবকাশ ভিসার নির্দিষ্ট কোটা।
নিউজিল্যান্ডের পক্ষ থেকে ভারতে ১৫ বছরে ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ উৎসাহিত করার অঙ্গীকার।
আপেল, কিউই ফল ও মধুর জন্য কৃষি উৎপাদনশীলতা অংশীদারিত্ব ও উৎকর্ষ কেন্দ্র স্থাপন।
ভারতের উৎপাদন খাতের জন্য শুল্কমুক্ত কাঁচামাল: কাঠের গুঁড়ি, কোকিং কয়লা, ধাতব বর্জ্য ও স্ক্র্যাপ।
আয়ুষ, সংস্কৃতি, মৎস্য, অডিও–ভিজ্যুয়াল, পর্যটন, বনায়ন, উদ্যানতত্ত্ব ও ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান ব্যবস্থায় সহযোগিতা।
শুল্কবহির্ভূত বাধা দূর করতে উন্নত নিয়ন্ত্রক সহযোগিতার বিধান।
২০২৪–২৫ সালে দ্বিপাক্ষিক পণ্য বাণিজ্য ১.৩ বিলিয়ন ডলার এবং পণ্য–পরিষেবার মোট বাণিজ্য প্রায় ২.৪ বিলিয়ন ডলার।

About Author

Advertisement