ভারত কি আওয়ামী লীগের থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে?

f0aa2d40-ae08-11ee-b42f-df17fb4d9992.jpg

নয়া দিল্লি: ভারত ও বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের সম্পর্ক শুধু ঐতিহাসিক নয়, বরং গভীর আস্থার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময় যে সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল, তা গত পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে নানা উত্থান-পতনের মধ্যেও টিকে রয়েছে।
মাত্র দেড় বছর আগেও, যখন আওয়ামী লীগ তাদের ইতিহাসের অন্যতম কঠিন সময় পার করছিল, তখন ভারত দলের নেত্রী শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছিল। তাঁকে ভারতে নিরাপদ স্থানে রাখা হয়েছিল এবং তিনি এখনও উচ্চ নিরাপত্তার মধ্যে ভারতের সম্মানিত অতিথি হিসেবে অবস্থান করছেন।
এছাড়া, ৫ আগস্ট ২০২৪ থেকে এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতা ও কর্মী—প্রাক্তন সাংসদ, মন্ত্রী, সমর্থক ও রাজনৈতিক সংগঠক, ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন।
এই সময়ে ভারত বারবার আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে যে তারা বাংলাদেশে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ ও ‘অংশগ্রহণমূলক’ নির্বাচন চায়। যার স্পষ্ট অর্থ ছিল, আওয়ামী লীগকেও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। কিন্তু তা হয়নি। আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির পর বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন দলটিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনুমতি দেয়নি। ফলে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন আওয়ামী লীগকে ছাড়াই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
দিল্লির বহু বিশ্লেষকের মতে, ভারত সবসময় বাংলাদেশে কেবল একটি রাজনৈতিক দলকেই সমর্থন করবে, এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। ভারতের প্রাক্তন কূটনীতিক সৌমেন রায় বিবিসিকে বলেন, “আন্তর্জাতিক সম্পর্কে স্থায়ী বন্ধু বা স্থায়ী শত্রু বলে কিছু নেই। আওয়ামী লীগ বন্ধু ছিল, কাজ হয়েছে, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জাতীয় স্বার্থ। ভারত সবসময় নিজের জাতীয় স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেবে।”
আওয়ামী লীগের সমর্থকেরাও সাধারণ মানুষ। কিন্তু “আমরা শুধু আওয়ামী লীগের সঙ্গেই সম্পর্ক রাখব, অন্য কারও সঙ্গে নয়”, এমন অবস্থান বাস্তবসম্মত নয় এবং ভারত সরকারও তা করবে না।
ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালিসিস (আইডিএসএ)-এর সিনিয়র ফেলো স্মৃতি পট্টনায়ক বলেন, ভারত সক্রিয়ভাবে আওয়ামী লীগের পুনরুত্থানের জন্য এগিয়ে আসবে না। বাংলাদেশে নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও বাণিজ্যিক স্বার্থ বিবেচনায় রেখে ভারত নিজেকে কেবল একটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইবে না।
শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের সম্ভাবনা ভারতে নেই। লন্ডন-ভিত্তিক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রিয়জিত দেবসরকারের মতে, ভারত সবসময় ধর্ম বা জাতিগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, বহুত্ববাদ এবং অভিন্ন বাঙালি সাংস্কৃতিক পরিচয়ের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতারা মনে করেন, ভারত ও আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক সম্পর্ক এত সহজে ভেঙে যাওয়ার নয়। অভিনেত্রী থেকে নেতা হওয়া রোকেয়া প্রাচী বলেন, “ভারত শুধু আওয়ামী লীগের বন্ধু নয়—ভারত বাংলাদেশের বন্ধু। বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র আওয়ামী লীগ ছাড়া সম্ভব নয়।”
১৯৭১ সালে ভারত ও আওয়ামী লীগের মধ্যে যে আস্থা, নির্ভরতা, স্নেহ ও আবেগের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন তা মুছে দিতে পারে না। আওয়ামী লীগকে নির্বাচন থেকে বাইরে রাখা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রকে দুর্বল করা প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্যও অস্থিরতা ও উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সে সময় তিনি দিল্লির পাণ্ডারা রোডের একটি সরকারি ফ্ল্যাটে থাকতেন। আজ তিনি আবার ভারতের অতিথি, তবে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে।
গতবার আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় ফিরতে ২১ বছর সময় লেগেছিল। এবার তারা ফিরতে পারবে কি না, এবং কত সময় লাগবে—তা সম্পূর্ণভাবে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কৌশল ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।

About Author

Advertisement