সিলগুড়ি: “ভারত আমার দেশ মহান — বিশ্বকে আত্মজ্ঞান দেয়। ”মানব সেবা সমিতি, উত্তর–পূর্বাঞ্চল, সিলগুড়ির উদ্যোগে উত্তর পালাশের মঝুয়া গ্রামে অবস্থিত মানব ধর্ম প্রাঙ্গণে আয়োজিত দুই দিনের সদ্ভাবনা সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভাষণ দিতে গিয়ে মানব ধর্মের প্রবর্তক সত্পালজি মহারাজ এই কথা ব্যক্ত করেন।
ভারতের আধ্যাত্মিক সম্পদের মাহাত্ম্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ভারত ভূমি সবসময়ই ঋষি-মহর্ষিদের তপোবন হিসেবে পরিচিত। এই পবিত্র ভূমি থেকেই সত্য, অহিংসা, প্রেম, করুণা এবং আত্মবোধের অমৃতধারা সমগ্র বিশ্বে প্রবাহিত হয়েছে। বেদ, উপনিষদ, গীতা এবং সাধু-সন্তদের ঐশীবাণী মানবজাতিকে আত্মজ্ঞান ও পরম শান্তির পথ দেখিয়ে এসেছে। ভারতের এই আধ্যাত্মিক মহিমা আজও সমগ্র মানবতার পথপ্রদর্শক।
সমাজে সদ্ভাব, নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিক চেতনার জাগরণ ছাড়া সুশিক্ষিত মানবজীবন সম্ভব নয়, উল্লেখ করে মহারাজ বলেন, মানুষের জীবনের প্রকৃত সাফল্য কেবল ভৌতিক সমৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং অন্তর্দৃষ্টি, প্রেম ও আত্মবোধেই তার সার্থকতা।
মানব ধর্মের মূল শিক্ষা স্মরণ করিয়ে তিনি বলেন, ধর্ম মানে মানুষে মানুষে প্রেম, করুণা ও সেবা; আর এগুলোই সত্য ধর্মের স্তম্ভ। নিজেকে জানা এবং “বসুধৈব কুটুম্বকম্” সমগ্র বিশ্ব এক পরিবার এই ভাবনাকে বাস্তবে ধারণ করাই ধর্মের মূল উদ্দেশ্য।
মহারাজের মতে, জাতি, ধর্মীয় সম্প্রদায়, ভাষা, সংস্কৃতি, দেশ বা অঞ্চল যাই আলাদা হোক না কেন, সব মানুষই একই পরম চেতনার অংশ। তাই একে অপরের প্রতি বোঝাপড়া, সহনশীলতা ও সদ্ভাব গড়ে তোলা আজকের সময়ের প্রধান প্রয়োজন।
ধ্যান, সুমিরণ ও আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে আত্মজ্ঞান অর্জন করা যায় বলে তিনি উল্লেখ করেন। বাহ্যিক আড়ম্বর নয়, বরং অন্তরের অভিজ্ঞতাই প্রকৃত আধ্যাত্মিকতা এ কথা তিনি জোর দিয়ে বলেন।
দেশ–বিদেশ থেকে আগত সাধু-সন্ত, ভক্ত ও শ্রদ্ধালুদের উদ্দেশে বক্তৃতা দিতে গিয়ে মহারাজ বলেন, বিশ্ব পরিবর্তন করার আগে নিজেকে পরিবর্তন করা জরুরি। মানুষের অন্তর্দেশে পরিবর্তন এলে তবেই সমাজ, দেশ এবং শেষ পর্যন্ত সমগ্র বিশ্বে ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব।
শ্রী হংসজি মহারাজের ১২৫তম পবিত্র জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে তার আধ্যাত্মিক, সামাজিক ও মানবকল্যাণমূলক ভাবনার কথা স্মরণ করে সত্পালজি মহারাজ বলেন, সন্তদের শিক্ষা কেবল শোনার জন্য নয়, জীবনে বাস্তবায়নের জন্য। হংসজি মহারাজ যে আধ্যাত্মিক জ্ঞান দিয়েছেন, সেটিকে আজও বাস্তবে পালন করাই তার প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
‘জন জাগরণ পদযাত্রা’র স্মৃতিচারণ করে তিনি জানান ১৯৮৫ সালের অক্টোবরে সিলগুড়ির গান্ধী ময়দান থেকে শুরু হওয়া ১৪ দিনের পদযাত্রা প্রায় ২৫০ কিলোমিটার হাঁটতে হাঁটতে দার্জিলিং হয়ে গ্যাংটক পর্যন্ত সম্পন্ন হয়েছিল। এর লক্ষ্য ছিল সামাজিক সচেতনতা, জাতীয় ঐক্য ও সাংস্কৃতিক সম্প্রীতির প্রসার। বিশেষ করে নেপালি ভাষাকে ভারতীয় সংবিধানের অষ্টম তফসিলে স্বীকৃতি দেওয়ার আন্দোলনে এই পদযাত্রা ঐতিহাসিক সাফল্য এনে দেয়। অংশগ্রহণকারী সকল সহযাত্রীদের অবদান তিনি অবিস্মরণীয় বলে উল্লেখ করেন।
৩১ ডিসেম্বর দুপুরে সম্মেলনস্থলের প্যারেড গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত মানব সেবা দল ও আধ্যাত্মিক যুব সংগঠনের পিটি-প্যারেড, বিভিন্ন ভাষাভাষীর সাংস্কৃতিক নৃত্য এবং হংস ব্যান্ডের পরিবেশনা পরিদর্শন করে মহারাজ মানব সেবা দলের শৃঙ্খলা ও একতার প্রশংসা করেন। অংশগ্রহণকারী শিল্পীদেরও তিনি প্রশংসা করেন এবং সবাইকে পুরস্কার প্রদান করেন।
সম্মেলনের প্রথম দিন সন্ধ্যায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিকিমের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী পি.এস. গোলে। সদগুরুর করকমল দিয়ে প্রদীপ প্রজ্বলনের মধ্য দিয়ে দুই দিনের সদ্ভাবনা সম্মেলনের উদ্বোধন হয়। মুখ্যমন্ত্রী জানান— প্রতি বছর নতুন বছর সত্পালজি মহারাজের সান্নিধ্যে পালন করতে পারা তার জন্য সৌভাগ্যের। তিনি বলেন, মহারাজ বিশ্বমানবতার কল্যাণে যে কাজ করছেন, সিকিম সরকার মানব ধর্মের প্রসারে আগামীতেও সহযোগিতা করবে।
প্রথম দিনে ভারত ও নেপালের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত আত্মানুভূতিধারী সাধু-মহাত্মারা নেপালি, হিন্দি ও সাদরি ভাষায় আধ্যাত্মিক বক্তৃতা দেন। সংস্কৃতি বিভাগের শিল্পীরা ভজন, নৃত্য ও নাট্য পরিবেশন করেন এবং শ্রী হংসজি মহারাজের জীবনদর্শনের ওপর ভিত্তি করে একটি নাটকও মঞ্চস্থ হয়।
এ বছরের সদ্ভাবনা সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন মুম্বাইয়ের বিশিষ্ট সমাজসেবক শ্রী সুরেশ ভাইয়া জোশী, উত্তরাখণ্ডের পাওড়ি গাড়োয়ালের শ্রী রাকেশ নৈথানি, শ্রী ওমপাল বিস্ত, শ্রী গণেশ রাওয়াত, শ্রী সঞ্জয় সাজওয়ান, শ্রী সীমা সাজওয়ান, দার্জিলিংয়ের রাজু বিস্ত প্রমুখ।
সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে যুব শক্তির প্রবর্তক বিভূজি মহারাজ বলেন—
যুবসমাজই দেশ ও সমাজের মেরুদণ্ড। তিনি যুবকদের নেশামুক্ত, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও ইতিবাচক জীবনদৃষ্টি গ্রহণের আহ্বান জানান।
দেশ–বিদেশ থেকে আগত ভক্ত ও সমাজসেবীদের উচ্ছ্বসিত উপস্থিতিতে সম্মেলনস্থলে আধ্যাত্মিক উৎসাহ ও আনন্দের পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
শেষপর্যন্ত ৩১ ডিসেম্বর রাত ১২টায় সত্পালজি মহারাজের করকমল থেকে একটি মোমবাতি জ্বালিয়ে, সেই আগুন থেকেই উপস্থিত সবাই একটি করে মোমবাতি জ্বালান। বিশ্বশান্তি, মানবতা, সদ্ভাবনা ও আধ্যাত্মিক উন্নতির প্রার্থনার মধ্য দিয়ে ২০২৫ সালকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছর ২০২৬-কে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানানো হয়।










