বেলভেডিয়ার হাউস: ভারতে ঐতিহ্য ভাইসরয়ের বাসভবন

3196215847_9b90166762_b

বেবি চক্রবর্ত্তী

কোলকাতা: ঔপনিবেশিক আমলে বেলভেডিয়ার হাউস একসময় ছিল ভারতের ভাইসরয়ের বাসভবন। ১৯৪৭ সালে ভাইসরয় উপাধির অবসান হলে এটি পরে সরকারি বাসভবনে পরিণত হয়। বর্তমানে এই বেলভেডিয়ার হাউস পুরানো কলকাতার নস্টালজিয়া। এই শব্দটি মূলত সুইস ভাড়াটে সৈন্যদের দ্বারা অনুভূত স্বগৃহের প্রতি অনুভূতিকে বোঝানো হয়। ১৬৮৮ সালে জোহানেস হোফার বাসেল-এ তাঁর গবেষণাপত্রে এই শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। প্রাচীন গ্রিক শব্দ নষ্টোস, যার অর্থ বাড়ি ফেরা এবং আলজিয়া, যার অর্থ ব্যথা—এই দুটি শব্দের সমন্বয়ে তৈরি। জার্মান শব্দ হেইমওয়ের সমতুল্য হিসেবে এই শব্দটিকে হোফার ব্যবহার করেন। পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ থেকে জোরপূর্বক বিচ্ছিন্নতার সাথে যুক্ত নৈতিক যন্ত্রণার অবস্থানকে এই শব্দের দ্বারা নির্দেশ দেওয়া হত। পাশাপাশি মনোবিজ্ঞানীদের মতে নস্টালজিয়ার দুটি স্বতন্ত্র প্রকার রয়েছে—পুনরুদ্ধারমূলক নস্টালজিয়া এবং প্রতিফলিত নস্টালজিয়া।

ভারতে বৃহত্তম মহানগর, প্রায় কল্পনাপ্রসূত গল্পের পাতা থেকে নেওয়া আশ্চর্য চমৎকার ছবির মতো শহর—কলকাতা, একটি সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক শহর। ১৭৭১ থেকে ১৯১১ সাল—দীর্ঘ প্রায় ১৪০ বছর ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী ছিল এই কলকাতা। নিজেদের সুবিধার জন্য জঙ্গল কেটে কলকাতা শহরের পত্তন করে আধুনিক শহর তৈরি করে ব্রিটিশরা—যে আধুনিক শহরে বাসা বেঁধেছিলেন বহু দেশীয় জমিদার, অভিজাত ব্যক্তি এবং সাধারণ মানুষ। কলকাতা এমন একটি সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার যা উনিশ ও বিশ শতকের প্রথম দিকের বেঙ্গল রেনেসাঁর কেন্দ্র এবং ভারতের ব্রিটিশ রাজধানী হিসেবে কাজ করেছে। কলকাতার সেই গৌরবময় অতীত প্রতিফলিত হয় তার স্মৃতিস্তম্ভ, কাঠামো এবং স্থাপত্যের অলৌকিকতার মাধ্যমে। ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে গেলেও সেই সব নিদর্শন আজও সদর্পে রয়ে গেছে তিলোত্তমা কল্লোলিনী কলকাতার বুকে।
এই বেলভেডিয়ার হাউস ওরফে হেস্টিংস হাউস আলিপুর চিড়িয়াখানার কাছে অবস্থিত একটি বিশাল সাদা বাড়ি, যা জাতীয় গ্রন্থাগারের অন্যতম ঐতিহ্য এবং ব্রিটিশ ভারতের প্রথম আবাসস্থলগুলির একটি।
ব্রিটিশদের সাহায্যে সিরাজদৌল্লাকে গদিচ্যুত এবং হত্যা করার পর মুর্শিদাবাদের সিংহাসনে বসলেও ব্রিটিশদের বিশাল অংকের টাকার দাবি মেটাতে না পারায় সিংহাসন ছেড়ে এই বাড়িতেই চলে আসেন মীরজাফর।
পরবর্তীকালে এই বাড়িটি তিনি উপহার স্বরূপ দিয়ে যান বলে কথিত আছে। এই এস্টেটে ৩০ একর জমি রয়েছে, যার মধ্যে ১৯৪৮ সাল থেকে রয়েছে ভারতের জাতীয় গ্রন্থাগার। ১৮৫৪ সালে গভর্নর জেনারেলকে স্থানান্তরিত করার পর বাংলা লেফটেন্যান্ট গভর্নর বেলভেডিয়ার হাউসে বসবাস শুরু করেন। ১৯১১ সালে ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত হলে তিনি গভর্নর হিসেবে এই সরকারি বাড়িতে বসবাস শুরু করেন।
বেলভেডিয়ার কথাটি স্থাপত্যবিদ্যার একটি পরিভাষা, যার অর্থ হলো কোনো উঁচু জায়গায় তৈরি বাড়ি, যেখান থেকে বহুদূর পর্যন্ত দেখা যায়। রোমের ভ্যাটিকানে বেলভেডিয়ার গ্যালারি এবং ভিয়েনায় বেলভেডিয়ার প্রাসাদ আছে, যার কিয়ৎ অনুকরণে কলকাতার এই হাউসটি তৈরি। বলা যায় এটি একটি স্থাপত্য কাঠামো, যা একটি সুন্দর বা মনোরম দৃশ্যের সুবিধা গ্রহণের জন্য নির্মিত। এই হাউসটি হেস্টিংসের অত্যন্ত প্রিয় ছিল, যেখানে স্থাপত্য জুড়ে রয়েছে ইতালীয় নবজাগরণের ছোঁয়া।
এই বেলভেডিয়ার হাউস তৈরি হয়েছিল কবে তার সঠিক তথ্য জানা না গেলেও ‘কলকাতা অ্যালবাম’ বইয়ের লেখক অশোক মিত্রের লেখা থেকে জানা যায়, এই ভবনটি তৈরি করেন বাদশা ওরঙ্গজেবের নাতি শাহজাদা আজিম-উস-শান। বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার সুবেদার হিসেবে থাকার জন্য ১৭০০ সালে তিনি এই বেলভেডিয়ার হাউসটি নির্মাণ করেন। ১৭৬৪ সালে বক্সারের যুদ্ধের পরে হেস্টিংস ইংল্যান্ডে ফিরে যাওয়ার পর গভর্নর হ্যারি ভেরেলেস্ট ১৭৬৭ সাল থেকে ১৭৬৯ সাল এবং পরে জন কার্টার ১৭৬৯ সাল থেকে ১৭৭২ সাল পর্যন্ত এই হাউসে বসবাস করেন। গভর্নর হ্যারির কাছে এই ভবনটি ছিল তার ‘গ্রাম্য আবাস’। ১৭৮০ সালের ১৭ আগস্ট বেলভেডিয়ার উত্তর-পশ্চিম দিকে বাগান চত্বরে ঘটেছিল এক ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বযুদ্ধ। এই দ্বন্দ্বযুদ্ধে হেস্টিংস ও ফ্রান্সিস দুজনেই বেঁচে গেলেও হেস্টিংসের ছোঁড়া গুলিতে আহত হন স্যার ফিলিপ ফ্রান্সিস।
১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পর জাতীয় গ্রন্থাগারের একটি অংশ হয়ে পড়ে এই বেলভেডিয়ার হাউস। তবে প্রশ্ন ওঠে—এটি কি শুধুই ইতিহাস? বর্তমানে এই হাউসকে ঘিরে যে কাহিনি তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে একটি হলো ভৌতিক জনপ্রিয়তা এবং অন্যটি গুপ্তধনের বিষয়। মীরজাফর থেকে হেস্টিংস—নানা ইতিহাসের সাক্ষী এই ভবন।
স্বাধীনতা ও দেশভাগের পর ইম্পেরিয়াল গ্রন্থাগারের নতুন ঠিকানা হয় এই বেলভেডিয়ার হাউস, নামকরণ করা হয় জাতীয় গ্রন্থাগার। ১৯৫৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী মৌলানা আবুল কালাম আজাদ এই জাতীয় গ্রন্থাগারের দরজা সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেন। এখানে রয়েছে দুষ্প্রাপ্য বহু পুঁথি, পাণ্ডুলিপি এবং মানচিত্র। ভারতের প্রথম সংবাদপত্র ‘হিকিস গেজেট’ এই গ্রন্থাগারের অমূল্য সম্পদ।
‘হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল’ গ্রন্থের লেখক বাকল্যান্ড জানান, ১৭৮০ সালে ৬০,০০০ টাকায় ওয়ারেন হেস্টিংস বেলভেডিয়ার হাউস বিক্রি করে দেন মেজর টলিকে। মাত্র চার বছর পর টলি মারা গেলে এই হাউসটি তার আইনজীবী জনসনের কাছে যায়। ১৮০২ সালে এই হাউসটি নিলামে ওঠে, তখন জমির পরিমাণ ছিল ৭২ বিঘা ৮ কাঠা ৪ ছটাক। পরবর্তীতে বার্ষিক ৩৫০ ইউরোতে লিজ নেন উইলিয়াম অগাস্টাস ব্রুকি। এরপর তিনি হাউসটির সংস্কার করেন। ক্রমান্বয়ে হাউসটির হাত বদল হতে থাকে এবং শেষে ১৮৫৪ সালে প্রিন্সেপ পরিবার এটি বিক্রি করে দেয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে।
এই হাউসের চারপাশে তখন ছিল প্রচুর বাঁশঝাড় এবং লম্বা বাঁশের ধনুকের মতো নুয়ে পড়া সৌন্দর্য। ভিতরে ছিল অনেক পুকুর, জলপদ্ম ও নলফুলের অপূর্ব দৃশ্য। কলাগাছ, বাদামগাছ, তুলাগাছসহ নানা গাছপালা ও লতাপাতায় ঘেরা ছিল এই প্রাসাদসম ভবন।
এই হাউসের উত্তর দিকে সিঁড়ি, মাঝখানে নাচঘরের কাঠের মেঝে তৈরি হয় অ্যাশলি ইডেনের আমলে। স্টুয়ার্ট কোলভিন বেইলির আমলে তৈরি হয় উত্তর-পূর্ব দিকের কাঠঘেরা ভোজনকক্ষ এবং এলিয়টের সময় তৈরি হয় পশ্চিমদিকের দোতলার বিলাসবহুল ঘরগুলি। পরে তৈরি হয় পূর্বদিকের বিশাল নাচঘর এবং দরবার মহল, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ১১৪ ফুট। এভাবে বাংলার তৎকালীন শাসকদের আমলে ১৮৫৪ সালের পর থেকে বেলভেডিয়ার হাউসের বর্তমান রূপ গড়ে ওঠে। মালিকানা পরিবর্তনের পাশাপাশি স্থাপত্য ও গৃহবিন্যাসের দিক থেকেও এটি কলকাতার একটি অনন্য ঐতিহাসিক ভবন।
বাংলার প্রথম লেফটেন্যান্ট গভর্নর ফ্রেডরিক হ্যালিডে এই সরকারি ভবনের প্রথম বাসিন্দা। তাঁর সঙ্গে পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিশেষ সম্পর্ক ছিল। মাঝে মাঝে বিদ্যাসাগর শিক্ষা সংক্রান্ত আলোচনার জন্য এখানে আসতেন।
এই ভবন বহু আগেই পুরাতত্ত্ব বিভাগের অধীনে আসে। গ্রন্থাগার স্থানান্তরের পর থেকেই শুরু হয় সংস্কারের কাজ। আলমারির আড়াল থেকে দেখা যায় অগ্নিকুণ্ড, নাচঘরের কাঠের মেঝে, ঘোরানো কাঠের সিঁড়ি—সবকিছুতেই রয়েছে পুরনো দিনের ছোঁয়া। ১৯৮৭ সালে এই ঘোরানো সিঁড়িতেই ফ্রান্সের সর্বোচ্চ সম্মান ‘লেজিও দনর’ পুরস্কারে সম্মানিত হন সত্যজিৎ রায়। ২০১১ সালে এখানেই হয়েছিল চীনা সংস্কৃতির বৃহৎ প্রদর্শনী। বর্তমানে এটিকে একটি জাদুঘর বা সংগ্রহশালায় রূপান্তরের কথাও ভাবা হচ্ছে।
১৯১১ সালে ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত হলে এটি ভাইসরয়ের বাসভবনে পরিণত হয়। ১৯৪৭ সালে সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। আজ বেলভেডিয়ার হাউস নিজেই এক জীবন্ত ইতিহাস।

About Author

Advertisement