কলকাতা: দীর্ঘ দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গে রেল উন্নয়নের গতি তুলনামূলকভাবে ধীর ছিল। বহু প্রকল্প বছরের পর বছর অসম্পূর্ণ অবস্থায় থেকে যায় এবং রাজ্যের রেল পরিকাঠামোর আধুনিকীকরণও প্রয়োজনীয় গতিবেগ পায়নি। তবে বর্তমানে পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দূরদর্শী নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গ ভারতীয় রেলের বৃহৎ রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে উঠে এসেছে।এই রূপান্তর শুধুমাত্র নতুন রেললাইন ও স্টেশন নির্মাণেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি সংযোগব্যবস্থা, নিরাপত্তা, যাত্রীসুবিধা এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। বর্ধিত বাজেটের মাধ্যমে উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করা-পরিসংখ্যানই এই রূপান্তরের স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। ২০০৯-১৪ সময়কালে পশ্চিমবঙ্গের জন্য রেলের গড় বার্ষিক বাজেট বরাদ্দ ছিল প্রায় ৪,৩৮০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে এই বরাদ্দ তিন গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ১৪,২০৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এই অভূতপূর্ব বৃদ্ধি বর্তমান সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকারকে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করে, যার লক্ষ্য রাজ্যের রেল পরিকাঠামোকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়া। এই বর্ধিত বিনিয়োগের ফলে রাজ্যে বৃহৎ পরিসরে রেল পরিকাঠামোর রূপান্তর ঘটছে। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৯৩,০০০ কোটি টাকা মূল্যের রেল প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। এই প্রকল্পগুলির মধ্যে রয়েছে নতুন রেললাইন নির্মাণ, স্টেশন পুনর্বিকাশ, নিরাপত্তা উন্নয়ন এবং রেলের সক্ষমতা সম্প্রসারণ। এর লক্ষ্য রাজ্যের প্রতিটি অংশকে দ্রুততর ও উন্নত রেল সংযোগের আওতায় নিয়ে আসা। রেল স্টেশনগুলি হয়ে উঠেছে আধুনিক ‘সিটি সেন্টার’যাত্রীদের অভিজ্ঞতাকে আরও আধুনিক, সুবিধাজনক এবং বিশ্বমানের করে তুলতে পশ্চিমবঙ্গে অমৃত ভারত স্টেশন প্রকল্পের আওতায় বৃহৎ পরিসরে রেল স্টেশনগুলির পুনরায় বিকাশ করা হচ্ছে। এই উচ্চাভিলাষী কর্মসূচির অধীনে রাজ্যের মোট ১০১টি রেল স্টেশনকে প্রায় ৩,৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ে পুনর্বিকাশের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। এই স্টেশনগুলিকে উন্নত যাত্রীসুবিধা, আধুনিক পরিকাঠামো এবং আকর্ষণীয় কিন্তু কার্যকর নকশার মাধ্যমে উন্নত করা হচ্ছে, যাতে এগুলি আশপাশের এলাকার জন্য আধুনিক নগরকেন্দ্র হিসেবেও বিকশিত হতে পারে। এই পর্যন্ত রাজ্যের নয়টি রেল স্টেশনের পুনর্বিকাশের কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এগুলি হল – আনাড়া, বরাভূম, হলদিয়া, জয়চণ্ডী পাহাড় জংশন, কল্যাণী ঘোষ পাড়া, কামাখ্যাগুড়ি, পানাগড়, সিউড়ি এবং তমলুক। এর মধ্যে জয়চণ্ডী পাহাড় জংশন, কল্যাণী ঘোষপাড়া এবং পানাগড়ের পুনর্বিকাশ করা স্টেশনগুলি ইতিমধ্যেই উদ্বোধন করা হয়েছে।এই উন্নত স্টেশনগুলিতে এখন উন্নতমানের ওয়েটিং রুম, উন্নতধরনের চিহ্নিতকরণ ব্যবস্থা ও আলোকসজ্জা, ডিজিটাল তথ্যব্যবস্থা, প্রশস্ত চলাচল এলাকা, খাদ্যকেন্দ্র, পার্কিং সুবিধা, নির্বিঘ্ন চলাচলের জন্য পৃথক প্রবেশ ও প্রস্থান পথ, সহজ প্রবেশযোগ্যতার জন্য লিফট ও এসকেলেটর, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং নান্দনিকভাবে নকশাকৃত স্টেশন ভবনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।এই সমস্ত সুবিধা যাত্রীদের জন্য রেলযাত্রাকে আরও আরামদায়ক, নিরাপদ এবং আনন্দদায়ক করে তুলছে। আধুনিক ট্রেন পরিষেবার বিস্তারের মাধ্যমে সংযোগব্যবস্থার সম্প্রসারণ-রাজ্যে সংযোগব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা এবং যাত্রীদের আধুনিক রেল পরিষেবা প্রদান করার লক্ষ্যে প্রিমিয়াম ট্রেন পরিষেবাও দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। ভারতীয় রেল পশ্চিমবঙ্গকে দেশের বিভিন্ন প্রধান শহরগুলির সঙ্গে যুক্ত করতে একাধিক আধুনিক ও উচ্চপ্রযুক্তিসম্পন্ন ট্রেন পরিষেবা পরিচালনা করছে।বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ থেকে এক জোড়া বন্দে ভারত স্লিপার এক্সপ্রেস ট্রেনের পরিষেবা চালু রয়েছে, যা দূরপাল্লার যাত্রাকে আরও আরামদায়ক ও সুবিধাজনক করে তুলছে।এছাড়াও রাজ্যের বিভিন্ন প্রধান শহর ও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্রকে সংযুক্ত করতে ১৮টি বন্দে ভারত এক্সপ্রেস এবং ২২টি অমৃত ভারত এক্সপ্রেস পরিষেবা পরিচালিত হচ্ছে। এই ট্রেনগুলি যাত্রীদের জন্য দ্রুত, আধুনিক এবং সাশ্রয়ী ভ্রমণ অভিজ্ঞতা প্রদান করছে। এই পরিষেবাগুলির সূচনার ফলে ভ্রমণের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং বিশ্বমানের রেলযাত্রা সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে এসেছে। এগুলির মাধ্যমে রাজ্যের প্রধান শহর, বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং পর্যটন গন্তব্যগুলির মধ্যে সংযোগ আরও শক্তিশালী হয়েছে। এর ফলে আঞ্চলিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক কার্যকলাপও ত্বরান্বিত হচ্ছে। রাজ্যে রেলের নতুন রূপ-পশ্চিমবঙ্গে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্প্রসারণেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা গেছে। ২০১৪ সাল থেকে রাজ্যে প্রায় ১,৪০০ কিলোমিটার নতুন রেললাইন নির্মিত হয়েছে, যা সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর সমগ্র রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার থেকেও বেশি।রেল বিদ্যুতায়নের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ১,৭১২ কিলোমিটার রেলপথ বিদ্যুতায়িত করা হয়েছে এবং বর্তমানে রাজ্যের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা ১০০ শতাংশ বিদ্যুতায়িত হয়েছে।নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে রাজ্যে ৫০০টিরও বেশি রেল ফ্লাইওভার ও আন্ডারপাস নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়াও ভারতীয় রেলের স্বদেশি ট্রেন সুরক্ষা ব্যবস্থা ‘কবচ’ এর সম্প্রসারণ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গে ইতিমধ্যেই ১০৫ রুট কিলোমিটার জুড়ে কবচ ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে এবং ১,০৪১ রুট কিলোমিটার এলাকায় কাজ এখনও চলছে। মোট ৩,২০০ রুট কিলোমিটার জুড়ে এই ব্যবস্থার বাস্তবায়নের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।রাজ্যের জন্য নতুন প্রকল্প ও পরিষেবা-পশ্চিমবঙ্গ রেল উন্নয়নের ক্ষেত্রে আরও একটি বড় অগ্রগতির পথে এগোচ্ছে। অমৃত ভারত স্টেশন প্রকল্পের আওতায় পুনর্বিকশিত কামাখ্যাগুড়ি, তমলুক, হলদিয়া, বরাভূম, আনাড়া এবং সিউড়ি রেলওয়ে স্টেশনগুলি শীঘ্রই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী উদ্বোধন করবেন। এর পাশাপাশি বেলদা-দাঁতন অংশে তৃতীয় রেললাইন এবং খড়গপুর বিভাগের কালাইকুন্ডা-কানিমাহুলি অংশে অটোমেটিক ব্লক সিগন্যালিং প্রকল্প জাতির উদ্দেশে উৎসর্গ করা হবে।এছাড়াও পুরুলিয়া থেকে আনন্দ বিহার টার্মিনাল (দিল্লি) পর্যন্ত একটি নতুন এক্সপ্রেস ট্রেন পরিষেবার সূচনা করা হবে। এই পরিষেবা পশ্চিমবঙ্গ এবং জাতীয় রাজধানীর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সুবিধাজনক রেল সংযোগ প্রদান করবে। উন্নত ভবিষ্যতের পথে-এই সমস্ত উদ্যোগকে একসঙ্গে বিবেচনা করলে স্পষ্ট হয় যে পশ্চিমবঙ্গে রেল উন্নয়নের এক নতুন অধ্যায় রচিত হচ্ছে। এই রূপান্তর শুধু রেল প্রকল্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি রাজ্যের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বাণিজ্যিক কার্যকলাপ এবং সামাজিক সংযোগকেও দ্রুততর করছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ভারতীয় রেলে যে ঐতিহাসিক রূপান্তর ঘটছে, তা পশ্চিমবঙ্গে একটি শক্তিশালী, আধুনিক ও ভবিষ্যৎ-প্রস্তুত পরিবহণ ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করছে।এই সামগ্রিক পরিবর্তন বিকশিত ভারতের লক্ষ্যে বিকশিত পশ্চিমবঙ্গের স্বপ্নকে আরও শক্তিশালী করবে।









