বেবি চক্রবর্ত্তী
সভ্যতার আদিযুগে, সিন্ধু সভ্যতার ধুলো-মাটির ভেতরেই বোনা হয়েছিল এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ধারার সূচনা। সেই ধারার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারতের লোকজ শিল্প, মানুষের হাতের কাজ, প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান। আঞ্চলিক ঘাস, জলাভূমি আর মানুষের নান্দনিক মন—এই তিনের মেলবন্ধনেই জন্ম নিয়েছিল এক অনবদ্য শিল্পধারা, যার নাম মাদুর। প্রথমদিকে এই শিল্প হয়তো ছিল নীরব, গৃহস্থালির পরিধিতেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, বিশেষত উনিশ শতকের নবজাগরণের আলোয়, মাদুর হয়ে উঠল শুধু ব্যবহারিক বস্তু নয়, একটি শিল্পচিহ্ন, এক সাংস্কৃতিক পরিচয়।একটি তৃণ, কিছু দক্ষ হাত আর বহু জীবনের ওঠাপড়া, এই নিয়েই গড়ে উঠেছিল মাদুরকে কেন্দ্র করে জীবন ও জীবিকার এক বিস্তৃত জগৎ। গ্রামবাংলার শিক্ষা, বৈঠক, আপ্যায়ন, বিশ্রাম—সবকিছুর নীরব সাক্ষী ছিল এই মাদুর। মাটির ঘরের দাওয়ায় কিংবা উঠোনে পাতা মাদুরে বসে গড়ে উঠত সম্পর্ক, গল্প, স্মৃতি। শিশুর প্রথম পাঠ থেকে প্রবীণের বিশ্রাম—সবখানেই ছিল মাদুরের অবিচ্ছেদ্য উপস্থিতি।মাদুর প্রধানত তিন প্রকারের। প্রথমটি ‘মসলন্দ’—শৈল্পিক উৎকর্ষের নিরিখে যা আজও প্রথম সারিতে। দ্বিতীয়টি দৈনন্দিন ব্যবহারের সাধারণ মাদুর এবং তৃতীয়টি আধুনিক তাঁতে বোনা মাদুর। বিশেষ করে ‘মসলন্দ’ তার সূক্ষ্ম বুনন, নান্দনিক নকশা ও দীর্ঘস্থায়িত্বের জন্য একসময় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছিল। এই শিল্পের মধ্যেই প্রতিফলিত হতো মানুষের কর্মব্যস্ত জীবন, আঞ্চলিক দক্ষতা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির আত্মপরিচয়। সম্ভবত ‘মাদুর’ শব্দটির উৎপত্তি সংস্কৃত ‘মন্দুরা’ থেকে, যার মূল উপাদান এক বিশেষ তৃণ, যা আজ মাদুর কাঠি নামে পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গের সবং, রামনগর, এগরা, উদয়নারায়ণপুর প্রভৃতি অঞ্চলে এই শিল্প একসময় ছিল জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বহু পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই শিল্পকেই জীবিকা হিসেবে বেছে নিয়েছিল।আজ গ্রামবাংলায় মাটির বাড়ি বা কুঁড়ে ঘরের সংখ্যা কমে এলেও, এখনও অনেক বাড়িতে অতিথি আপ্যায়নের অঙ্গ হিসেবে মাদুরের ব্যবহার চোখে পড়ে। শহর কিংবা গ্রাম-দাওয়া বা বারান্দায় মাদুর পেতে বসে গল্প করার দৃশ্য আজও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। তবু বাস্তবতা হলো, এই ঐতিহ্য ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে অবলুপ্তির পথে।একজন মাদুর শিল্পী দিনের পাঁচ-ছয় ঘণ্টা সময় ব্যয় করে নিপুণ হাতে যে শিল্পসত্তাকে বুনে তুলতেন, আজ সেই শ্রমের মূল্য মিলছে না। একদিকে কাঁচামালের দাম বেড়েছে, অন্যদিকে কমেছে মাদুরের চাহিদা। বদলে গেছে আমাদের জীবনযাপন, বদলে গেছে রুচি। আধুনিক কার্পেট, হালফ্যাশনের দৃষ্টিনন্দন সামগ্রী প্রতিযোগিতার বাজারে দখল নিয়েছে। তার চাপে চরম বিপাকে পড়েছেন বহু মাদুর শিল্পী।একসময় কাঠি কিনে, শ্রম ঢেলে, মাদুর বুনে যে মানুষগুলি সসম্মানে জীবিকা নির্বাহ করতেন, আজ তাঁদের অনেককেই চোখের জলে নিজের হাতে বোনা শিল্পকর্ম নিয়ে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে। সামান্য রোজগারের আশায় তাঁরা হাটে যান, কিন্তু ক্রেতার অভাবে ফিরে আসেন হতাশ হয়ে। সেই হতাশা শুধু ব্যক্তিগত নয়, তা প্রজন্মান্তরের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার আর্তনাদ। ফলে দিশাহীন অবস্থায় মুখ ফিরিয়ে নিতে হচ্ছে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বহু কর্মী ও তাঁদের উত্তরসূরিদের।সর্বগ্রাসী মন্দার বাজারে এই ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প আজ ফিকে হয়ে আসছে। পেটের টানে হারিয়ে যেতে বসেছে শিল্পীদের শিল্পসত্তা। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে কালোসোনা মাঝির মতো বহু মাদুর শিল্পীকে আর কানু পাটের সুভাষ হাটে যেতে দেখা যায় না। জীবনের প্রয়োজনে তাঁরা অন্য পথে হাঁটছেন, রেখে যাচ্ছেন শতাব্দীপ্রাচীন এক শিল্পকে।যে মাদুর এতদিন আমাদের সংস্কৃতিকে ধারণ ও লালন করেছে, আজ তা বিলুপ্তির মুখে। আমাদের হৃদয়-মন্দিরে বেঁচে থাকা এই হস্তশিল্প আগামী প্রজন্মের কাছে হয়তো একদিন রূপকথার মতো শোনাবে। তবু স্মৃতির ভাঁজে, মাটির গন্ধে আর মানুষের হাতের ছোঁয়ায় মাদুর থেকে যাবে—নীরব সাক্ষী হয়ে, হারিয়ে যাওয়া এক ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে।








