নয়াদিল্লি: সোমবার ও মঙ্গলবার লোকসভায় পরিস্থিতি বেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এর কারণ ছিল কংগ্রেস সাংসদ ও বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর ভাষণ, যা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়।
তিনি কারভান ম্যাগাজিন-এ প্রকাশিত একটি অপ্রকাশিত বই ‘ফোর স্টার্স অফ ডেস্টিনিy’ থেকে নেওয়া একটি প্রবন্ধের অংশ পড়তে চেয়েছিলেন। এই বইটি লিখেছেন ভারতের প্রাক্তন সেনাপ্রধান জেনারেল মনোজ মুকুন্দ (এমএম) নরভানে।
সোমবার লোকসভায় রাহুল গান্ধী বলেন, “এই পত্রিকায় নরভানে জি লিখেছেন যে এটি তাঁর স্মৃতিকথা, যেটি সরকার প্রকাশ করতে দিচ্ছে না। আমি শুধু এর পাঁচটি লাইন পড়তে চাই।”
এতেই বিজেপি নেতারা আপত্তি জানান এবং বলেন, অপ্রকাশিত বইয়ের অংশ কীভাবে সংসদে পড়া যায়।
এরপর রাহুল গান্ধী শাসক দলের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, “এরা বলে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে, কিন্তু একটি উদ্ধৃতিকে ভয় পাচ্ছে। এতে এমন কী লেখা আছে যে ওরা ভয় পাচ্ছে এবং আমাকে পড়তে দিচ্ছে না? যদি ভয় না পায়, তাহলে আমাকে পড়তে দিন।”
রাহুল গান্ধী যে অপ্রকাশিত বইয়ের অংশ পড়ছিলেন, মিডিয়া রিপোর্ট অনুযায়ী সেটি ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বাজারে আসার কথা ছিল। কিন্তু ভারতীয় সেনা বইটি যাচাই করছে।
ইংরেজি দৈনিক দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানুয়ারি ২০২৪-এ জানায়, প্রকাশক পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউসকে বলা হয়েছিল—যাচাই সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত বইয়ের কোনও অংশ বা সফট কপি কাউকে না দিতে।
এই যাচাই প্রক্রিয়ায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রকও কোনও না কোনও স্তরে যুক্ত ছিল বলে জানা যায়। তখন থেকে এখনও পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া চলছে।
জেনারেল মনোজ মুকুন্দ নরভানে ডিসেম্বর ২০১৯ থেকে এপ্রিল ২০২২ পর্যন্ত ভারতের ২৮তম সেনাপ্রধান (চিফ অব আর্মি স্টাফ) ছিলেন।
তিনি এমন এক সময় ভারতীয় সেনার নেতৃত্ব দেন, যখন বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারি চলছিল এবং লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় চিনের সঙ্গে ভারতের উত্তেজনা তুঙ্গে।
মনোজ নরভানে পুনের জ্ঞান প্রবোধিনী স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। পরে তিনি পুনের ন্যাশনাল ডিফেন্স একাডেমি (খড়কবাসলা) এবং ইন্ডিয়ান মিলিটারি একাডেমির মাধ্যমে সেনাবাহিনীতে অফিসার হন।
যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে পড়াশোনা ও লেখালেখিতেও তাঁর গভীর আগ্রহ রয়েছে। তিনি ইন্দোরের দেবী অহিল্যা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কনজারভেশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজে এম.ফিল. ডিগ্রি অর্জন করেন।
তাঁর বাবা মুকুন্দ নরভানে ভারতীয় বায়ুসেনার একজন অফিসার ছিলেন। তাঁর স্ত্রী একজন শিক্ষিকা এবং তাঁদের দুই কন্যা সন্তান রয়েছে।
জেনারেল নরভানের সামরিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল ২০২০ সালের লাদাখ সংঘাত।
ইকোনমিক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,
“সরকারি সেনা নথি ও তাঁর নিজের পুরনো বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের জুনে পেট্রোলিং পয়েন্ট ১৪-এ উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। চিনা সেনারা নির্ধারিত বাফার জোন থেকে তাদের তাঁবু সরাতে অস্বীকার করে। কর্নেল সন্তোষ বাবুর নেতৃত্বে ভারতীয় সেনারা বাধা দিতে গেলে সংঘর্ষ বেধে যায়। এই সময় জেনারেল নরভানে ভারতের কৌশলে বড় পরিবর্তন আনেন—আগের শুধুমাত্র প্রতিরক্ষামূলক নীতির বদলে তিনি ‘অফেন্সিভ ডিফেন্স’ গ্রহণ করেন।”
রিপোর্টে আরও বলা হয়,
“নরভানে কৈলাস রেঞ্জে ভারতীয় ট্যাঙ্ক মোতায়েন করেন, যার ফলে চিনা সেনারা পিছিয়ে যেতে বাধ্য হয়। তিনি ১৬ জুন ২০২০-কে তাঁর কর্মজীবনের ‘সবচেয়ে দুঃখের দিন’ বলে উল্লেখ করেন, কারণ ওই দিন ২০ জন ভারতীয় সেনা শহিদ হন।”
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর আরেকটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই বইয়ে ২০২০ সালে পূর্ব লাদাখে চিনের সঙ্গে হওয়া সামরিক সংঘাতের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। এতে গালওয়ান উপত্যকার সংঘর্ষ এবং অগ্নিপথ প্রকল্পের কথাও উল্লেখ আছে। পাশাপাশি ৩১ আগস্ট ২০২০-র রাতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে তাঁর কথোপকথনের বিবরণও রয়েছে।
এক্সপ্রেস জানায়, ডিসেম্বর ২০২৩-এ সংবাদ সংস্থা পিটিআই জেনারেল নরভানের বই থেকে কিছু অংশ প্রকাশ করেছিল। সেখানে ৩১ আগস্টের সন্ধ্যার ঘটনাটির বিস্তারিত বিবরণ ছিল। একই ঘটনার উল্লেখ কারভান ম্যাগাজিন-এর প্রবন্ধেও রয়েছে।
লোকসভায় বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী ওই প্রবন্ধে ছাপা অংশই সংসদে পড়তে চেয়েছিলেন। পরে কংগ্রেস দল সোশ্যাল মিডিয়ায় কারভান ম্যাগাজিনের সেই পৃষ্ঠাগুলি পোস্ট করে, যেখানে ৩১ আগস্টের সন্ধ্যার ঘটনার উল্লেখ ছিল।
লন্ডন স্পিকার ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, নরভানের সময়কালেই ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগের আওতায় ১১,০০০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের একাধিক বড় অস্ত্র ক্রয় প্রকল্প শুরু হয়। এর ফলে ভারতীয় সেনাবাহিনী নিজস্ব অস্ত্র উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়ায় এবং বিদেশি নির্ভরতা কমে।
এছাড়া সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর ন্যাশনাল ডিফেন্স একাডেমি (এনডিএ)-তে মহিলাদের ক্যাডেট হিসেবে প্রবেশের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তও নরভানের কার্যকালেই নেওয়া হয়। এটি সেনাবাহিনীতে লিঙ্গ সমতার ক্ষেত্রে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়।
সেনাপ্রধান হওয়ার আগে নরভানে কলকাতায় পূর্ব কমান্ডের প্রধান ছিলেন। তিনি দিল্লিতে জেনারেল অফিসার কমান্ডিং হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
অপারেশন পবনের সময় তিনি শ্রীলঙ্কায় নিযুক্ত ভারতীয় শান্তিরক্ষা বাহিনীর সদস্য ছিলেন এবং মিয়ানমারের ভারতীয় দূতাবাসে তিন বছর কাজ করেছেন।
প্রাক্তন সেনাপ্রধান জেনারেল এমএম নরভানে একাধিকবার সম্মানিত হয়েছেন।
জম্মু-কাশ্মীরে ব্যাটালিয়নের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তিনি সেনা মেডেল, নাগাল্যান্ডে আসাম রাইফেলস (উত্তর)-এর ইন্সপেক্টর জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য বিশিষ্ট সেবা মেডেল, স্ট্রাইক কোরের নেতৃত্বের জন্য অতি বিশিষ্ট সেবা মেডেল এবং আর্মি ট্রেনিং কমান্ডে জেনারেল অফিসার কমান্ডিং হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য পরম বিশিষ্ট সেবা মেডেল লাভ করেছেন।










