দেবেন্দ্র কে. ঢুঙ্গানা
নেপালের রাজনীতি আবারও একটি ঐতিহাসিক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত দল, পুরোনো নেতৃত্ব এবং পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে ক্লান্ত হয়ে পড়া জনগণ এখন নতুন বিকল্পের দিকে তাকাতে শুরু করেছে। এই প্রেক্ষাপটে কাঠমান্ডুর মেয়র বালেন শাহের মতো নতুন প্রজন্মের একজন প্রতিনিধির জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে আসা কেবল একটি সাধারণ ঘটনা নয়; বরং এটি নেপালের রাজনীতিতে পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত।
নেপালে ২০০৮ সালে ২৩৯ বছরের পুরোনো রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং একটি ফেডারেল গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ২০১৫ সালে নতুন সংবিধান কার্যকর হয়। কিন্তু সংবিধান কার্যকর হওয়ার পরও দেশ স্থিতিশীল সরকারের অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারেনি। জোট রাজনীতি, ক্ষমতার সমীকরণ, দলগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং মতাদর্শের চেয়ে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি রাষ্ট্র পরিচালনাকে দুর্বল করে দিয়েছে। এই অসন্তোষের মাটিতেই এখন একটি নতুন শক্তির উত্থান ঘটেছে—যাকে অনেকেই “জেন–জি রাজনীতি” হিসেবে দেখছেন।
যদি বালেন শাহের নেতৃত্বে এই নতুন শক্তি ক্ষমতায় আসে, তবে তা শুধু নেতৃত্বের পরিবর্তন হবে না; বরং এটি নেপালের জনগণের পক্ষ থেকে পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দেওয়া একটি স্পষ্ট ও কঠোর বার্তা হবে। জনগণের বার্তা পরিষ্কার—এখন আর পুরোনো স্লোগানে নয়, বরং বাস্তব ফলাফলের ভিত্তিতে রাজনীতির মূল্যায়ন হবে।
তবে এখান থেকেই একটি জটিল প্রশ্নও শুরু হয়। নতুন নেতৃত্বের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা অত্যন্ত বিস্তৃত ও সীমাহীন। প্রত্যাশা যখন পাহাড়সমান হয়, তখন ব্যর্থতার ক্ষেত্রে হতাশাও তত গভীর হয়। তাই এই পরিবর্তন শুধু একটি সুযোগ নয়, বরং একটি বড় ঝুঁকিও বটে।
নেপালের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে দুটি বড় ছায়ার মধ্যে ঘুরপাক খেয়েছে ভারত এবং চীন। ভৌগোলিকভাবে ছোট দেশ হলেও কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে নেপাল অত্যন্ত সংবেদনশীল অবস্থানে রয়েছে। দক্ষিণে ভারতের সঙ্গে উন্মুক্ত সীমান্ত এবং উত্তরে হিমালয়ের ওপারে চীন। এই ভূ–রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বহুবার প্রভাবিত হয়েছে।
নেপালের অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, নেপালে বিদেশি হস্তক্ষেপ হঠাৎ করে ঘটে না; বরং তা প্রায়ই “আমন্ত্রিত হস্তক্ষেপ” হয়ে থাকে। অর্থাৎ এখানকার রাজনৈতিক শক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য বাইরের শক্তিকে ব্যবহার করে। এই প্রবণতা জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নকে সবসময়ই জটিল করে তুলেছে।
যখন বালেন শাহের মতো নতুন প্রজন্মের নেতা উঠে আসেন, তখন প্রশ্নটি আরও তীব্র হয়ে ওঠে নেপাল তার পররাষ্ট্রনীতি কোন পথে এগিয়ে নেবে? ভারতের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ককে কীভাবে ভারসাম্যপূর্ণ রাখবে? চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে কীভাবে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করবে?
নেপালের জন্য ভারত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাণিজ্য, পরিবহন, জ্বালানি এবং কর্মসংস্থানসহ নানা ক্ষেত্রে নেপাল ভারতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। কিন্তু ২০১৫ সালের অবরোধের পর নেপালের অভ্যন্তরে ভারতের প্রতি অসন্তোষও বেড়েছে—এটিও একটি বাস্তবতা। সেই কারণেই নেপাল তার নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে।
চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্পগুলো এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। তবে চীনের সঙ্গে সহযোগিতাও সহজ নয়। ঋণের চাপ, কৌশলগত প্রভাব এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের মতো নানা প্রশ্ন এর সঙ্গে জড়িত।
এমন পরিস্থিতিতে নতুন নেতৃত্বকে অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করতে হবে। অন্ধ জাতীয়তাবাদ দিয়ে যেমন দেশ পরিচালনা সম্ভব নয়, তেমনি সম্পূর্ণ পরনির্ভর কূটনীতিও কোনো অগ্রগতির পথ দেখাতে পারে না। নেপালকে তার জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে নীতি নির্ধারণ করতে হবে।
তবে নেপালের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু পররাষ্ট্রনীতি নয় অভ্যন্তরীণ শাসন ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
নেপালে দুর্নীতি, বেকারত্ব, দুর্বল প্রশাসন এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা গুরুতর সমস্যার রূপ নিয়েছে। লক্ষ লক্ষ তরুণ কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। গ্রামগুলো ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে এবং শহরগুলো বিশৃঙ্খলভাবে বিস্তৃত হচ্ছে।
যদি নতুন নেতৃত্ব এসব সমস্যার সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারে, তবে জনগণের হতাশা আরও গভীর হয়ে উঠতে পারে।
কাঠমান্ডুর মেয়র হিসেবে বালেন শাহ কিছু সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন যেমন অবৈধ স্থাপনা অপসারণ এবং প্রশাসনিক সংস্কারের চেষ্টা। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে কাজ করা অনেক বেশি জটিল। সেখানে শুধু ইচ্ছাশক্তি যথেষ্ট নয়; প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাও জরুরি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো দলের ভেতরের ক্ষমতার ভারসাম্য। নতুন দলগুলোতে প্রায়ই নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব দ্রুত সামনে আসে। যখন ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, তখন রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়।
যদি নতুন নেতৃত্ব দলীয় অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে না পারে, তবে পরিবর্তনের স্বপ্ন দ্রুতই বিতর্কে পরিণত হতে পারে।
নেপালের ইতিহাস দেখিয়েছে, জনগণের বিশ্বাস অর্জন করা কঠিন, কিন্তু তা হারানো খুব সহজ।
যদি জনগণের জনাদেশকে সম্মান না করা হয়, যদি জনগণের কণ্ঠস্বর আবারও উপেক্ষা করা হয়, তবে ভবিষ্যতে গুরুতর সংকট দেখা দিতে পারে। হতাশ জনগণ কখনো কখনো চরম বিকল্পের দিকেও ঝুঁকতে পারে। এমন পরিস্থিতি দেশকে অস্থিতিশীলতা ও সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
নেপাল একবার সশস্ত্র সংঘাতের কঠিন সময় পার করেছে। সেই ক্ষত আজও সমাজে রয়ে গেছে। তাই এখনকার রাজনীতিকে অবশ্যই জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান করতে হবে।
আজকের নেপাল পরিবর্তনের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। পুরোনো রাজনীতি ধীরে ধীরে দুর্বল হচ্ছে এবং নতুন রাজনীতির জন্ম হচ্ছে। কিন্তু ইতিহাস আমাদের এটাও শেখায় শুধু নতুন নেতৃত্ব যথেষ্ট নয়; নতুন চিন্তা এবং নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি।
যদি নতুন শক্তি সত্যিকার অর্থে জনগণের বিশ্বাসকে সম্মান করতে পারে, তবে নেপাল স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন এবং আত্মনির্ভরতার পথে এগিয়ে যেতে পারে।
কিন্তু যদি আবারও ক্ষমতার স্বার্থ, বাহ্যিক প্রভাব এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কাদায় রাজনীতি আটকে যায়, তবে জাতিকে বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে হবে।
তাই আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো..
নেপাল কি সত্যিই একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারবে?
কারণ শেষ পর্যন্ত একটি দেশের ভবিষ্যৎ কোনো এক নেতা বা দলের হাতে নয়; বরং জনগণের সচেতনতার উপরই নির্ভর করে।
যদি জনগণের জনাদেশকে সম্মান করা হয়, তবে নেপাল সম্ভাবনার উজ্জ্বল পথে এগিয়ে যাবে।
কিন্তু যদি সেই জনাদেশকে আবারও রাজনৈতিক খেলায় পরিণত করা হয়, তবে ইতিহাস হয়তো নতুন এক সংকটের অধ্যায়ও খুলে দিতে পারে।










