কালিয়াচকের ঘটনায় শীর্ষ আদালতের কড়া তোপের মুখে রাজ্য পুলিশ প্রশাসন

Lavc57.107.100

কলকাতা(শুভাশিস বিশ্বাস): পশ্চিমবঙ্গে বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা প্রক্রিয়া চলাকালীন বিচারকদের উপর হামলার ঘটনায় শীর্ষ আদালত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের নেতৃত্বে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি বিপুল পঞ্চোলির বেঞ্চ বৃহস্পতিবার নির্দেশ দেয়, এই ঘটনাকে আদালতের উপর সরাসরি আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে এবং এর তদন্তভার কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা অথবা জাতীয় তদন্ত সংস্থার হাতে তুলে দিতে হবে। আদালত আরও জানায়, বিচারকদের উপর হামলা শুধু আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি বিচারব্যবস্থার উপর প্রত্যক্ষ আঘাত—যা কোনওভাবেই সহ্য করা হবে না।
প্রসঙ্গত, বুধবার রাতে মালদার একটি গ্রামে বিশেষ পুনর্বিবেচনা কাজে নিযুক্ত সাতজন বিচারককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘেরাও করে রাখা হয়। তাঁদের উদ্ধার করে ফেরানোর সময় গাড়ির উপর ইট-পাটকেল নিক্ষেপের অভিযোগও ওঠে। ওই সাতজনের মধ্যে তিনজন ছিলেন মহিলা বিচারক, যাঁদের দীর্ঘ সময় আটকে রাখা হয়। কলকাতা উচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতি সুজয় পালের পাঠানো পত্রের ভিত্তিতে শীর্ষ আদালত জানায়, পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর হয়ে উঠেছিল যে গভীর রাতে স্বরাষ্ট্রসচিব ও পুলিশ মহাপরিদর্শক প্রধান বিচারপতির বাসভবনে উপস্থিত হন। রাত বারোটার পর ওই বিচারকদের মুক্ত করা সম্ভব হয়।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হল, উদ্ধার করে ফেরানোর সময় বিচারকদের গাড়িতে পাথর নিক্ষেপ করা হয়। শীর্ষ আদালত পর্যবেক্ষণে জানায়, এটি কেবল বিচারকদের ভয় দেখানোর চেষ্টা নয়, বরং আদালতের ক্ষমতার উপর সরাসরি আঘাত। এরপর আদালত স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়, কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না এবং অবিলম্বে বিচারকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আদালত আরও বলে, বিশেষ পুনর্বিবেচনা প্রক্রিয়ায় নিযুক্ত বিচারকরা আদালতের “প্রসারিত হাত” হিসেবে কাজ করছেন; তাঁদের বাধা দেওয়া মানে বিচারব্যবস্থার উপরই আঘাত হানা।
কালিয়াচকের সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিকের কার্যালয়ে সাত বিচারককে আটকে রাখার ঘটনায় শুধু রাজ্য রাজনীতিতেই নয়, জাতীয় স্তরেও তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে বিষয়টি শীর্ষ আদালতের নজরেও আসে। ওই দিন বিশেষ পুনর্বিবেচনা সংক্রান্ত মামলার শুনানি ছিল। প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি বিপুল পঞ্চোলির বেঞ্চে শুনানি শুরু হতেই পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ ও প্রশাসন প্রশ্নের মুখে পড়ে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত আইনজীবী কপিল সিব্বল ও মেনকা গুরুস্বামীকে প্রশ্ন করেন, “কি ঘটেছে, তা কি দেখেছেন?” উত্তরে কপিল সিব্বল জানান, তিনি প্রতিবেদন পড়েছেন।
আদালতে কেন্দ্রের প্রধান আইন প্রতিনিধি তুষার মেহতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই ধরনের ঘটনা কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অন্যদিকে আবেদনকারীদের পক্ষে মেনকা গুরুস্বামী জানান, ঘটনাটি ছিল “অরাজনৈতিক প্রতিবাদ”। তবে প্রধান বিচারপতি স্পষ্ট করে দেন, আদালত এই বিষয়কে রাজনৈতিক রং দিতে চায় না।
এদিকে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী মন্তব্য করেন, “যাঁদের উপর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব রয়েছে, তাঁদের আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। কেন সময়মতো প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ হয়নি?” প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত আরও জানান, রাত এগারোটা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের কোনও প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে শীর্ষ আদালত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ জারি করে:
প্রথমত, বিচারকদের থাকার স্থান, সরকারি অতিথি গৃহসহ, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, কোনও বিচারকের পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা থাকলে তাৎক্ষণিক মূল্যায়ন করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
তৃতীয়ত, কোনও স্থানে পাঁচজনের বেশি মানুষের সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এছাড়াও এই ঘটনার জন্য রাজ্যের মুখ্যসচিব, পুলিশ মহাপরিদর্শক, জেলা শাসক ও পুলিশ সুপারকে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হয়েছে। কেন তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তার জবাব দিতে হবে। পাশাপাশি ৬ এপ্রিল তাঁদের দূরসংযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে আদালতে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শীর্ষ আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এই ধরনের ঘটনা আদালত অবমাননার পর্যায়ে পড়তে পারে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের আচরণ কোনওভাবেই সহ্য করা হবে না। অর্থাৎ, কালিয়াচকের এই ঘটনা এখন আর শুধু আইনি লড়াইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এতে প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত গুরুতর প্রশ্নও জড়িয়ে পড়েছে।

About Author

Advertisement