নয়াদিল্লি: পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় পুনর্নিরীক্ষণ (এসআইআর)–এর বর্তমান প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ চেয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়ে “গণতন্ত্র রক্ষার” আবেদন জানিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, এসআইআর–এর নামে পশ্চিমবঙ্গকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে এবং রাজ্যের নাগরিকদের অধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে।
বুধবার অনুষ্ঠিত শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি এবং বিচারপতি বিপুল এম. পাঞ্চোলির বেঞ্চ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবেদনের প্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচন আধিকারিককে নোটিস জারি করেছে। আদালত উভয় পক্ষকে ৯ ফেব্রুয়ারির মধ্যে জবাব দাখিলের নির্দেশ দিয়েছে।
শুনানিকালে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে স্বয়ং নিজের বক্তব্য পেশ করার অনুমতি দেওয়া হয়। তিনি বলেন, “পশ্চিমবঙ্গকে পরিকল্পিতভাবে নিশানা করা হচ্ছে। এখানকার মানুষের অধিকার পদদলিত করার চেষ্টা চলছে।” তিনি আরও জানান, এ বিষয়ে তিনি নির্বাচন কমিশনকে ছয়টি চিঠি লিখেছেন, কিন্তু কোথাও থেকে ন্যায়বিচার পাননি।
মুখ্যমন্ত্রীর পক্ষে উপস্থিত সিনিয়র অ্যাডভোকেট শ্যাম দিবান জানান, এসআইআর প্রক্রিয়ার আওতায় ‘যুক্তিগত অসঙ্গতি’র নামে বিপুল সংখ্যক ভোটারকে নোটিস পাঠানো হয়েছে। তাঁর দাবি, এখনও পর্যন্ত প্রায় ১.৩৬ কোটি ভোটারকে নোটিস দেওয়া হয়েছে, অথচ এই প্রক্রিয়া ১৪ ফেব্রুয়ারিতে শেষ হওয়ার কথা এবং সংশোধনের জন্য সময় খুবই কম।
দিবান বলেন, ২০০২ সালের ভোটার তালিকার ভিত্তিতে বাবা–মা ও সন্তানের নামের অমিল, বয়সের ক্ষেত্রে ১৫ বছরের কম বা ৫০ বছরের বেশি পার্থক্য—এইসব কারণ দেখিয়ে অসঙ্গতি বলে ভোটারদের হয়রানি করা হচ্ছে। বহু ক্ষেত্রে নামের বানানে সামান্য ভুল থাকলেও নোটিস জারি করা হয়েছে, যা সহজেই সংশোধন করা যেত।
প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত মন্তব্য করে বলেন, বাংলা ভাষায় উচ্চারণগত কারণে নামের বানানে পার্থক্য হতে পারে। তিনি স্পষ্ট করেন, ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় অভিবাসনের মতো বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে, কিন্তু কোনও অবস্থাতেই যোগ্য নাগরিকদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া উচিত নয়। “প্রতিটি সমস্যার সমাধান সম্ভব এবং নিশ্চিত করতে হবে যে কোনও নির্দোষ ব্যক্তি এতে বঞ্চিত না হন,” তিনি বলেন।
মুখ্যমন্ত্রী বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশন আধার কার্ড গ্রহণ করছে না এবং ভোটারদের কাছ থেকে অন্যান্য নথিপত্র চাওয়া হচ্ছে। তিনি আরও দাবি করেন, এসআইআর প্রক্রিয়ার সময় বহু জীবিত ব্যক্তিকে মৃত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সিনিয়র অ্যাডভোকেট রাকেশ দ্বিবেদী এই অভিযোগগুলি খারিজ করে বলেন, এসআইআর তদারকির জন্য রাজ্য সরকার উপ-মহকুমা স্তরের মাত্র ৮০ জন আধিকারিককে নিয়োগ করেছে। তিনি অভিযোগ করেন, অধিকাংশ জায়গায় আঙ্গনওয়াড়ি কর্মীর মতো নীচুস্তরের কর্মীদেরই কাজে লাগানো হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বন্দ্যোপাধ্যায় এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, নির্বাচন কমিশন যে সমস্ত সুবিধা ও সম্পদ চেয়েছে, রাজ্য সরকার সবই প্রদান করেছে।
এর আগে, ১৯ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল যে পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হতে হবে এবং এতে সাধারণ মানুষকে অসুবিধায় ফেলা যাবে না। আদালত নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দেয়, ‘যুক্তিগত অসঙ্গতি’ তালিকাভুক্ত ভোটারদের নাম গ্রাম পঞ্চায়েত ভবন ও ব্লক অফিসে প্রকাশ্যে টাঙিয়ে দিতে হবে।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান রূপে এসআইআর চালু থাকলে এর ফলে “বৃহৎ পরিসরে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা” হবে এবং “গণতন্ত্রের ভিত্তির ওপর আঘাত” নেমে আসবে।










