ওয়াশিংটন: ‘তৈল ধমনী’ হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে চলা উত্তেজনার মধ্যেই ইরান যুদ্ধ শেষ করার চিন্তাভাবনা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জানিয়েছেন, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তাদের লক্ষ্যের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে এবং পরিস্থিতি বিবেচনা করে মধ্যপ্রাচ্যে পরিচালিত সামরিক অভিযান গুটিয়ে নেওয়ার বিষয়টি ভাবা হচ্ছে।
সমাজমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, ইরানের বর্তমান শাসনের প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সামরিক অভিযান শেষ করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। তাঁর দাবি, এই অভিযানে ইরানের সামরিক পরিকাঠামো ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়েছে এবং দেশটির নৌ ও বায়ুসেনার সক্ষমতা প্রায় ভেঙে পড়েছে। পাশাপাশি তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরান যাতে ভবিষ্যতে কোনওভাবেই পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করবে যুক্তরাষ্ট্র।
ট্রাম্প আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র দেশগুলিকে রক্ষা করেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইজরায়েল, সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, বাহরিন এবং কুয়েতের মতো বন্ধু দেশগুলির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালী নিয়েও ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেন ট্রাম্প। তাঁর কথায়, যেসব দেশ এই জলপথ ব্যবহার করে, তাদেরই এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নেওয়া উচিত। যুক্তরাষ্ট্র নিজে এই পথ ব্যবহার করে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তবে কোনও দেশ যদি সাহায্য চায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা করতে প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।
উল্লেখ্য, শনিবার ইরান যুদ্ধের ২২তম দিন। এই সংঘর্ষে ইরানের বড় ক্ষয়ক্ষতি হলেও পাল্টা আঘাতে যুক্তরাষ্ট্রও ক্ষতির মুখে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে থাকা একাধিক মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত প্রায় ২০ দিনের লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি এফ–৩৫ যুদ্ধবিমান এবং ছয়টি কেসি–১৩৫ জ্বালানি বহনকারী বিমান ধ্বংস হয়েছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, ইরান পাল্টা হামলায় হাইফা-র তেল শোধনাগারসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন তেল ও গ্যাস ভাণ্ডারে আঘাত হেনেছে। হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
এই পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তীব্র হয়ে উঠেছে। এর মধ্যেই ইরানের তেলের উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা আংশিকভাবে শিথিল করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। ফলে ভারতের কয়েকটি জ্বালানি সংস্থা ইরান থেকে তেল কেনার পরিকল্পনা করছে। ইতিমধ্যে দেশের তিনটি সংস্থা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে তারা কেন্দ্র সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকের সঙ্গে পরামর্শ করছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এশিয়ার তেল আমদানিকারক দেশগুলির মধ্যে ভারতের অপরিশোধিত তেলের মজুত তুলনামূলকভাবে কম। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে রাশিয়া থেকে তেল কেনার ক্ষেত্রেও ছাড় দিয়েছিল। এবার ইরানের তেল কেনার ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা আংশিক তুলে নেওয়ায় সুযোগ নিতে আগ্রহী হয়েছে একাধিক সংস্থা।
মার্কিন অর্থ সচিব স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির পরিস্থিতি প্রশমিত করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রুশ তেলের মতোই ইরানের ক্ষেত্রেও ৩০ দিনের জন্য এই ছাড় দেওয়া হয়েছে এবং শুধুমাত্র সমুদ্রপথে তেল কেনার অনুমতি থাকবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ইরানের তেল কম দামে কিনে মজুত করছে চিন। সেই প্রক্রিয়াকে ভাঙতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, বিশ্ব জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে যুক্তরাষ্ট্র নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
এছাড়াও ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যে বিশ্ববাজারে অতিরিক্ত প্রায় ৪৪ কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহের ব্যবস্থা করেছে। মার্কিন অর্থ দফতরের মতে, এই ছাড়ের ফলে বিশ্ববাজারে আরও প্রায় ১৪ কোটি ব্যারেল তেল যোগ হবে, যা জ্বালানি সরবরাহের উপর চাপ কমাতে সাহায্য করবে।








