কলকাতা: আরজি কর হাসপাতালের লিফ্ট দুর্ঘটনার তদন্তে ফরেনসিক দলের প্রতিনিধিরা নমুনা সংগ্রহ করেছেন। ট্রমা কেয়ার ভবনের লিফ্ট কীভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল, যান্ত্রিক ত্রুটি কী কারণে ঘটল এবং একাধিক বোতাম চাপার ফলে লিফ্টে কোনও সমস্যা তৈরি হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নেরই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
শনিবার দুপুরে ফরেনসিক দল হাসপাতালে পৌঁছে ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করে। এই ঘটনায় গ্রেফতার পাঁচজনকে শনিবারই শিয়ালদহ আদালতে হাজির করানো হবে। পুলিশ তাদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানাবে।
উল্লেখ্য, আরজি কর হাসপাতালের লিফ্টে আটকে পড়ে দমদমের বাসিন্দা অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। তিনি তাঁর তিন বছরের সন্তানের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে এসেছিলেন। ভোররাতে ট্রমা কেয়ারের লিফ্টে তিনি আটকে পড়েন। তাঁর সঙ্গে স্ত্রী ও সন্তানও ছিলেন।
অভিযোগ, লিফ্ট হঠাৎই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। প্রথমে তা উপরে ওঠে, তারপর সরাসরি নেমে যায় বেসমেন্ট পর্যন্ত। সেখানে একবার দরজা খুলে যায়, ফলে অরূপের স্ত্রী ও সন্তান বাইরে বেরিয়ে আসতে পারেন। কিন্তু অরূপ বেরোনোর আগেই দরজা বন্ধ হয়ে যায় এবং লিফ্ট আবার উপরে উঠতে শুরু করে। সেই সময় লিফ্টের দরজায় আটকে গুরুতর জখম হন অরূপ।
বেসমেন্টে লিফ্টের বাইরে একটি লোহার গ্রিলের দরজা বন্ধ ছিল। পরিবারের অভিযোগ, সময়মতো তালা খোলা গেলে অরূপকে বাঁচানো সম্ভব ছিল। কিন্তু স্ত্রী ও সন্তানের চিৎকার সত্ত্বেও কেউ সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেনি এবং তালাও ভাঙা যায়নি।
সরকারি হাসপাতালগুলিতে লিফ্টের সামনে লিফ্টম্যান থাকার কথা। কিন্তু সেই সময় সেখানে কেউ উপস্থিত ছিলেন না কেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। শুক্রবার এই ঘটনায় তিনজন লিফ্টম্যান—মিলনকুমার দাস, বিশ্বনাথ দাস ও মানসকুমার গুহ—এবং নিরাপত্তারক্ষী আশরাফুল রহমান ও শুভদীপ দাসকে টালা থানার পুলিশ গ্রেফতার করে।
শনিবার ফরেনসিক দফতরের পদার্থবিদ্যা বিভাগের বিশেষজ্ঞদের একটি দল সংশ্লিষ্ট লিফ্ট থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছে। অরূপ ও তাঁর পরিবার কোন তলা থেকে লিফ্টে উঠেছিলেন, কোন বোতাম টিপেছিলেন এবং লিফ্ট তাঁদের কোথায় নিয়ে গিয়েছিল—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এছাড়াও যদি আগে থেকেই লিফ্টে কোনও যান্ত্রিক ত্রুটি থেকে থাকে, তা কেন অচল করে রাখা হয়নি—সেই প্রশ্নও উঠছে। রবিবার ফরেনসিক দফতরের জীববিদ্যা বিভাগের আধিকারিকরাও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবেন। যেখান থেকে অরূপের দেহ উদ্ধার করা হয়েছে, সেখান থেকেও নমুনা নেওয়া হয়েছে এবং বেসমেন্ট থেকেও প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে।
লিফ্টের রক্ষণাবেক্ষণে গাফিলতি ছিল কি না এবং দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ কী—তা জানার জন্য তদন্তকারীরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। লালবাজারের গোয়েন্দারাও বিষয়টি নজরে রেখেছেন। টালা থানা থেকে এখন এই মামলার তদন্তভার হোমিসাইড বিভাগ গ্রহণ করেছে।
অরূপের দেহের প্রাথমিক ময়নাতদন্তের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, তাঁর হাত, পা ও পাঁজর ভেঙে গিয়েছিল। হৃদ্যন্ত্র, ফুসফুস এবং যকৃতও গুরুতর আঘাতে ফেটে গিয়েছিল।
মৃতের পরিবারের অভিযোগ, বেসমেন্টে লিফ্টের বাইরে থাকা লোহার গ্রিলের দরজা খোলার জন্য তারা প্রায় দেড় থেকে দু’ঘণ্টা ধরে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। ঘটনাস্থলে অনেকেই উপস্থিত ছিলেন, এমনকি উর্দিধারী কেন্দ্রীয় বাহিনীর সদস্যরাও ছিলেন, যারা সাধারণত উদ্ধারকাজে দক্ষ। মৃতের দিদির অভিযোগ, বারবার অনুরোধ করার পরও কেউ তালা ভাঙতে এগিয়ে আসেননি। জানানো হয়েছিল, তালার চাবি পূর্ত দফতরের কাছে রয়েছে। পরিবারের দাবি, দ্রুত তালা ভেঙে ফেললে হয়তো অরূপকে বাঁচানো যেত।
এই ঘটনার একমাত্র প্রাপ্তবয়স্ক প্রত্যক্ষদর্শী অরূপের স্ত্রী। ফলে তাঁর বয়ান এই তদন্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। অনিচ্ছাকৃত হত্যার মামলা রুজু করে তদন্ত চলছে। আরজি কর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে একাধিক বৈঠক করেছে এবং শিগগিরই স্বাস্থ্য ভবনে একটি বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দেবে।









