কলকাতা: ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সবচেয়ে রহস্যময় অধ্যায়গুলির মধ্যে একটি হিসেবে বিবেচিত নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর অন্তর্ধান রহস্যকে কেন্দ্র করে নির্মিত ঐতিহাসিক চলচ্চিত্র ‘দ্য বোস ফাইলস- সচ ইয়া সাজিশ’-এর বিশেষ প্রদর্শনী ১৩ অক্টোবর কলকাতার নন্দন চলচ্চিত্র কেন্দ্রে আয়োজিত হয়েছে। পরিচালক রাজেশ গুপ্তা (আইআইটিয়ান) পরিচালিত এই ছবিটি নেতাজির ১৯৪৫ সালে কথিত বিমান দুর্ঘটনা এবং তাতে তাঁর মৃত্যুর প্রচলিত ধারণা নিয়ে প্রশ্ন তুলে, দশকের পর দশক ধরে অমীমাংসিত থাকা ঐতিহাসিক জিজ্ঞাসাকে পুনরায় জনসমক্ষে বিতর্কে আনার চেষ্টা করেছে।
রিয়েল রিলস প্রোডাকশনের প্রযোজনায় নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি ঐতিহাসিক নথিপত্র, প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান এবং নেতাজির শেষ পরিণতি সম্পর্কিত বিভিন্ন দাবিকে কাহিনির কাঠামোতে তুলে ধরেছে। ছবিটির মূল উদ্দেশ্য কোনো একটি সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা নয়, বরং ইতিহাসের বিতর্কিত দিকগুলিকে পুনরায় খতিয়ে দেখা এবং দর্শকদের প্রাপ্ত প্রমাণের ভিত্তিতে নিজেদের মতামত গঠনে অনুপ্রাণিত করা।
ইতিহাস, রহস্য এবং সিনেমার আন্তঃসম্পর্ক
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রভাবশালী নেতা এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রধান হিসেবে পরিচিত। তাঁর ব্যক্তিত্ব, বিপ্লবী দৃষ্টিভঙ্গি এবং স্বাধীনতার জন্য গৃহীত সশস্ত্র সংগ্রামের পথ আজও রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। ১৯৪৫ সালের বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যুর প্রচলিত বিবরণ সত্ত্বেও, সেই ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রশ্ন এবং বিকল্প দাবিগুলি জনস্বার্থের বিষয় হয়ে রয়েছে।
এই ঐতিহাসিক জিজ্ঞাসাকেই কাহিনির ভিত্তি করেছে ‘দ্য বোস ফাইলস- সচ ইয়া সাজিশ’, যা গবেষণা, স্মৃতি এবং রহস্যের সংমিশ্রণে দর্শককে অতীতের পুনর্পাঠের আমন্ত্রণ জানায়। যদিও, ঐতিহাসিক ঘটনার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত ছবির কাহিনিগত উপস্থাপনা এবং প্রমাণিত ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের মধ্যে পার্থক্য করা প্রয়োজন। ছবিতে উপস্থাপিত দাবিগুলিকে স্বতঃপ্রমাণিত তথ্য হিসেবে না ধরে, তার উৎস, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করাই যুক্তিযুক্ত দৃষ্টিভঙ্গি হবে।
দুই সত্যসন্ধানীর খোঁজে এগিয়ে চলা গল্প
চলচ্চিত্রের গল্প দুই সত্যসন্ধানী চরিত্রের যাত্রাকে কেন্দ্র করে। একজন গবেষক দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে নেতাজির রহস্যময় অন্তর্ধান রহস্যের খোঁজে রয়েছেন, অন্যদিকে একজন তরুণী ইতিহাসের অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছেন। ভিন্ন প্রজন্মের এই চরিত্রদের কৌতূহল এবং গবেষণা অতীতের ঘটনাকে বর্তমান প্রজন্মের সঙ্গে যুক্ত করার কাহিনিগত ভিত্তি তৈরি করে।
ছবিতে যতীন কার্যেকর নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন এবং অমিত বহল গোয়েন্দা ব্যুরো (আইবি)-র একজন আধিকারিকের চরিত্রে রয়েছেন। বীরেন্দ্র সাক্সেনা, অখিলেন্দ্র মিশ্র, অপূর্বা অরোরা, আকাশদীপ অরোরা, রাজীব কুমার এবং কাশ্বী গ্রোভারেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
প্রাক্তন প্রশাসক প্রশান্ত সিংহানিয়া ছবিটির সৃজনশীল উপদেষ্টা। নেতাজির উত্তরাধিকারকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, নেতাজির চিন্তা ও আদর্শকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে আনা প্রয়োজন। তাঁর মতে, নেতাজির ব্যক্তিত্ব থেকে তরুণ প্রজন্ম প্রেরণা নিয়ে জাতীয় স্বার্থে এগিয়ে যেতে পারে এমন পরিবেশ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ।
পরিচালকের দৃষ্টিতে সত্যের অনুসন্ধান
পরিচালক রাজেশ গুপ্তার মতে, ছবিটি নির্মাণের প্রধান উদ্দেশ্য বিভিন্ন প্রজন্ম ধরে ক্রমাগত উঠে আসা প্রশ্নগুলিকে কাহিনির মাধ্যমে উপস্থাপন করা এবং দর্শকদের ভাবতে ও আত্মমন্থন করতে অনুপ্রাণিত করা। তিনি আশা করেন যে দর্শকরা ছবিতে উপস্থাপিত বিষয়বস্তুকে শুধু বিনোদন হিসেবে গ্রহণ না করে নিজেরাই সত্য অনুসন্ধানের দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলবেন।
গুপ্তার আগের ছবিগুলির মধ্যে পুরস্কারপ্রাপ্ত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘চাড্ডি বাডিজ’ এবং ‘দ্য ফ্ল্যাট’ উল্লেখযোগ্য। এই দুটি স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি যৌথভাবে বারোটি পুরস্কার পেয়েছে বলে জানা গেছে। তাঁর হিন্দি ফিচার ফিল্ম ‘আনলক জিন্দেগি’ (২০২২) তেরোটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে নির্বাচিত হয়েছিল। ওই ছবিটি মিলান, মেক্সিকো এবং বোস্টনে শ্রেষ্ঠ কাহিনিভিত্তিক ফিচার ফিল্মের পুরস্কারও পেয়েছে বলে বিবরণে উল্লেখ আছে।
‘দ্য বোস ফাইলস- সচ ইয়া সাজিশ’ বিস্তারিত যাচাইকরণ প্রক্রিয়ার পর ভারতের কেন্দ্রীয় চলচ্চিত্র শংসাপত্র বোর্ড থেকে শংসাপত্র পেয়েছে বলে জানা গেছে। যদিও, ছবিটি শংসাপত্র পাওয়া এবং তাতে উপস্থাপিত ঐতিহাসিক দাবি স্বাধীনভাবে প্রমাণিত হওয়া দুটি ভিন্ন বিষয়।
সমালোচনামূলক দৃষ্টি: প্রশ্ন তোলা এবং সত্য প্রমাণ করা ভিন্ন বিষয়
‘দ্য বোস ফাইলস- সচ ইয়া সাজিশ’-এর প্রধান আকর্ষণ হলো ইতিহাসের একটি সংবেদনশীল ও বিতর্কিত বিষয়কে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পুনরায় বিতর্কে আনার প্রচেষ্টা। নেতাজির অন্তর্ধান প্রকরণ কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনার অনুসন্ধানই নয়, বরং জাতীয় স্মৃতি, রাজনৈতিক চেতনা এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের উত্তরাধিকারের সঙ্গেও জড়িত বিষয়। তাই এর ওপর ভিত্তি করে নির্মিত চলচ্চিত্র দর্শকের মধ্যে কৌতূহল জাগাতে এবং নতুন প্রজন্মকে ইতিহাসের প্রতি আকৃষ্ট করতে সক্ষম হতে পারে।
তবে ঐতিহাসিক বিষয়ে নির্মিত ছবির কার্যকারিতা কেবল প্রশ্ন তোলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। উপস্থাপিত প্রমাণের প্রাসঙ্গিকতা, উৎসের বিশ্বাসযোগ্যতা, তথ্য ও কল্পনার মধ্যে স্পষ্ট সীমারেখা এবং বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি নিরপেক্ষতাও এর বৌদ্ধিক বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ধারণ করে। বিশেষত নেতাজির মৃত্যু এবং অন্তর্ধান প্রকরণের মতো বিষয়ে রহস্যকে নাটকীয় করে তোলা এবং ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তকে প্রমাণের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা চ্যালেঞ্জিং।
এই ছবিটির মূল্যায়ন করার সময় প্রচলিত ধারণার ওপর প্রশ্ন তোলার দিকটিকে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন তোলা মানেই কোনো বিকল্প দাবির সত্যতার প্রমাণ নয়। ছবিতে উপস্থাপিত গবেষণা ও নথিপত্রকে ঐতিহাসিক আর্কাইভ, সরকারি তদন্ত এবং স্বাধীন গবেষণার সঙ্গে তুলনা করে দেখতে পারলে এই আলোচনা আরও অর্থবহ হয়ে উঠবে। প্রাপ্ত বিবরণের ভিত্তিতে ছবির কাহিনি ও উদ্দেশ্য নিয়ে আলোচনা করা গেলেও, এর সম্পূর্ণ শৈল্পিক প্রভাব, পরিচালনা, অভিনয় এবং ঐতিহাসিক প্রমাণের উপস্থাপনা সরাসরি না দেখে চূড়ান্তভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়।
সামগ্রিকভাবে, ‘দ্য বোস ফাইলস- সচ ইয়া সাজিশ’ ইতিহাসের অমীমাংসিত প্রশ্নগুলিকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং নেতাজির উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনাকে জীবন্ত রাখার উদ্দেশ্য নিয়েছে। ছবিটি যে প্রশ্ন তুলেছে তা দর্শককে ইতিহাসের গভীরে যেতে অনুপ্রাণিত করতে পারে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে কৌতূহলের পাশাপাশি প্রমাণ, বিবেক এবং সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গিও সমানভাবে প্রয়োজন।
ইতিহাস নীরব হয়ে গেছে বলে মনে হতে পারে, কিন্তু তার অর্থ সত্যের অনুসন্ধান শেষ হয়ে যাওয়া নয়। নেতাজির উত্তরাধিকারকে বোঝার যাত্রা প্রশ্ন থেকেই শুরু হয় এবং প্রমাণভিত্তিক বিচক্ষণ সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়ে যায়।





