ইউক্রেন যুদ্ধে জাদু দেখাতে পারেনি টি-১৪ ট্যাঙ্ক

Armata-1682405222

এবার ভারতকে বিক্রির প্রস্তুতি রাশিয়ার; কী কৌশল পুতিনের?

নয়াদিল্লি: ভারতীয় সেনাবাহিনী তাদের পুরনো টি-৭২ প্রধান যুদ্ধট্যাঙ্কের পরিবর্তে আধুনিক ও উন্নত ট্যাঙ্কের সন্ধান করছে। এরই মধ্যে রাশিয়া ভারতের সামনে তাদের অত্যাধুনিক টি-১৪ আর্মাটা ট্যাঙ্কের প্রস্তাব দিয়েছে। তবে এই প্রস্তাব ঘিরে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে রুশ সেনাবাহিনী এই ট্যাঙ্ককে ব্যাপকভাবে সম্মুখভাগে মোতায়েন করেনি। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, যে ট্যাঙ্কের ওপর রাশিয়া নিজেই পুরোপুরি ভরসা করতে পারছে না, সেটি ভারতকে বিক্রি করার চেষ্টা কেন করছে মস্কো?
বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়া টি-১৪ আর্মাটা ট্যাঙ্ককে আরও আধুনিক, মডিউলার এবং ওপেন-আর্কিটেকচার নকশায় উপস্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ভারতীয় সেনাবাহিনী এই প্রস্তাবে সম্মতি দিলে, নিজেদের সামরিক প্রয়োজন অনুযায়ী ট্যাঙ্কটির নকশা ও প্রযুক্তিতে পরিবর্তন আনার পাশাপাশি দেশেই উৎপাদনের সুযোগ পেতে পারে ভারত।
ভারতীয় চাহিদা অনুযায়ী টি-১৪ আর্মাটা তৈরির পরিকল্পনা
রাশিয়ার পরিকল্পনা হল, ভারতীয় সেনাবাহিনীর পরিচালনাগত চাহিদা অনুযায়ী টি-১৪ ট্যাঙ্কের সক্ষমতা উন্নত করা। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রের বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর গোলাবারুদ ব্যবস্থাপনায় উন্নতি এবং এক মিটারের বেশি লম্বা গোলাবারুদ ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া, ড্রোন হামলা থেকে ট্যাঙ্ককে রক্ষা করতে সক্রিয় সুরক্ষা ব্যবস্থা (এপিএস), অ্যান্টি-ড্রোন জ্যামার এবং হার্ড-কিল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যুক্ত করার পরিকল্পনাও প্রস্তাবের অংশ হতে পারে। হার্ড-কিল ব্যবস্থা আগত হুমকিকে সরাসরি ধ্বংস করে ট্যাঙ্কের সুরক্ষা নিশ্চিত করে।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর চাহিদার কথা মাথায় রেখে আরও শক্তিশালী ইঞ্জিন যৌথভাবে তৈরি করতেও রাশিয়া প্রস্তুত বলে জানা যাচ্ছে। এর ফলে ট্যাঙ্কটির গতিশীলতা এবং বিভিন্ন ভৌগোলিক পরিস্থিতিতে কাজ করার সক্ষমতা বাড়তে পারে।
ভারতকে টি-১৪ বিক্রির রুশ প্রচেষ্টা নতুন নয়
টি-১৪ আর্মাটা ভারতে তৈরি করা কিংবা যৌথভাবে উৎপাদনের প্রস্তাব রাশিয়া এই প্রথম দেয়নি। ২০২১ সালে রাশিয়ার ফেডারেল সার্ভিস ফর মিলিটারি-টেকনিক্যাল কো-অপারেশন (এফএসএমটিসি) জানিয়েছিল, ভারত-রাশিয়া আন্তঃসরকারি কমিশনের বৈঠকে আর্মাটা প্ল্যাটফর্মের ওপর ভিত্তি করে সাঁজোয়া যান যৌথভাবে তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
ভারতের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রধান যুদ্ধট্যাঙ্ক তৈরির পরিকল্পনাকে মাথায় রেখেই এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
এরপর ২০২৫ সালেও রুশ প্রতিরক্ষা সংস্থা উরালভাগনজাভোদ ভারতের পরবর্তী প্রজন্মের প্রধান যুদ্ধট্যাঙ্ক এবং ভবিষ্যৎ যুদ্ধযান কর্মসূচির আওতায় স্থানীয়ভাবে টি-১৪ উৎপাদনের প্রস্তাব দিয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে।
জানা যায়, এই পরিকল্পনায় রাশিয়ার মূল ইঞ্জিনের পরিবর্তে ভারতে তৈরি হতে থাকা ড্যাট্রান-১৫০০ হর্সপাওয়ার ইঞ্জিন ব্যবহারের সম্ভাবনা এবং ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (ডিআরডিও)-র অধীন কমব্যাট ভেহিকলস রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এস্টাবলিশমেন্টের (সিভিআরডিই) সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এই ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর হলে ট্যাঙ্কের নকশা, উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে ভারতের আত্মনির্ভরতা বাড়তে পারে।
ইউক্রেন যুদ্ধে টি-১৪-কে সম্মুখভাগ থেকে দূরে রাখল কেন রাশিয়া?
টি-১৪ আর্মাটা রাশিয়ার অন্যতম উচ্চাকাঙ্ক্ষী সাঁজোয়া যান প্রকল্প। এই ট্যাঙ্কে ক্রুদের জন্য সুরক্ষিত সাঁজোয়া কক্ষ, স্বয়ংক্রিয় গোলাবারুদ লোডিং ব্যবস্থা এবং আধুনিক সেন্সরের মতো প্রযুক্তি রয়েছে। তা সত্ত্বেও ট্যাঙ্কটি এখনও ব্যাপক উৎপাদন এবং নিয়মিত সামরিক ব্যবহারের পর্যায়ে পৌঁছতে পারেনি।
২০২৩ সালে রাশিয়া ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে কয়েকটি টি-১৪ ট্যাঙ্ক ব্যবহারের কথা জানিয়েছিল। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেগুলির ব্যবহার ছিল সীমিত এবং কিছু সময়ের মধ্যেই সেগুলিকে সম্মুখভাগ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। সরাসরি সম্মুখসমরে অংশ নেওয়ার পরিবর্তে তুলনামূলক নিরাপদ দূরত্ব থেকে গোলাবর্ষণের কাজে এই ট্যাঙ্কগুলি ব্যবহার করা হয়েছিল বলেও খবর প্রকাশিত হয়।
অন্যদিকে, যুদ্ধে রুশ সেনাবাহিনী মূলত টি-৭২, টি-৮০ এবং টি-৯০-এর মতো পুরনো কিন্তু পরিচিত ট্যাঙ্কের ওপর নির্ভর করেছে। এই ট্যাঙ্কগুলির উৎপাদন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং মেরামত তুলনামূলকভাবে সহজ। যুদ্ধের সময় বিপুল সংখ্যায় ট্যাঙ্কের প্রয়োজন হওয়ায় এগুলির ব্যবহারিক গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
রাশিয়ার সরকারি প্রতিরক্ষা গোষ্ঠী রোস্তেখের প্রধান সের্গেই চেমেজভও টি-১৪-এর অত্যধিক খরচ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যয়বহুল টি-১৪-এর পরিবর্তে তুলনামূলক সস্তা টি-৯০ ট্যাঙ্ক ব্যবহার করা রাশিয়ার জন্য বেশি বাস্তবসম্মত।
এই কারণেই টি-১৪-তে আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও এর প্রকৃত যুদ্ধক্ষমতা, নির্ভরযোগ্যতা এবং ব্যাপক উৎপাদনের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
ভারতের জন্য কতটা ব্যয়বহুল হতে পারে টি-১৪ চুক্তি?
ভবিষ্যতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিপুল সংখ্যায় আধুনিক প্রধান যুদ্ধট্যাঙ্কের প্রয়োজন হবে। পুরনো টি-৭২ ট্যাঙ্কের পরিবর্তন এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাঁজোয়া সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য প্রায় এক হাজার সাতশো বা তারও বেশি ট্যাঙ্কের প্রয়োজন হতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে শুধু প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে টি-১৪ নির্বাচন করা সম্ভব নয়। প্রতিটি ট্যাঙ্কের দাম, রক্ষণাবেক্ষণের খরচ, যন্ত্রাংশের প্রাপ্যতা, উৎপাদনক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত সহায়তাও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হবে।
ভারতে টি-১৪-এর উৎপাদন শুরু হলে স্থানীয় উৎপাদনের মাধ্যমে কিছু সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। তবে এর জন্য বড় অঙ্কের শিল্প বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং উৎপাদন পরিকাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজন হবে। ট্যাঙ্কটির উচ্চ মূল্য এবং রুশ সেনাবাহিনীতে সীমিত ব্যবহার ভারতের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এ ছাড়া, বিদেশি ট্যাঙ্ক প্রকল্পের কারণে ভারতের নিজস্ব প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং ভবিষ্যৎ প্রকল্পগুলি যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
ডিআরডিও ও বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পড়বে টি-১৪
ভারতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রধান যুদ্ধট্যাঙ্ক তৈরির লক্ষ্যে ডিআরডিও এবং বেসরকারি প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলিও কাজ করছে। দেশীয় নকশা, আধুনিক অস্ত্রব্যবস্থা, উন্নত সুরক্ষা এবং ভারতের ভৌগোলিক ও সামরিক পরিস্থিতির উপযোগী প্রযুক্তি তৈরি করাই এই উদ্যোগগুলির প্রধান লক্ষ্য।
রাশিয়ার প্রস্তাব ভারতীয় প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রের সরকারি সংস্থা এবং বেসরকারি সংস্থাগুলির সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে এগিয়ে যেতে পারে। তবে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অনুমোদন পাওয়ার ক্ষেত্রে টি-১৪-কে সহজ পথ পাড়ি দিতে হবে না।
দেশীয় ট্যাঙ্ক তৈরি হলে প্রযুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ, যন্ত্রাংশের উৎপাদন এবং ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে ভারত বেশি স্বাধীনতা পেতে পারে। অন্যদিকে, বিদেশি প্ল্যাটফর্ম যৌথভাবে উৎপাদন করলে তুলনামূলক কম সময়ে আধুনিক প্রযুক্তি অর্জনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তাই ভারতীয় সেনাবাহিনীর সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু কোন ট্যাঙ্ক বেশি শক্তিশালী, তা নির্ধারণ করা নয়। বরং দাম, নির্ভরযোগ্যতা, উৎপাদনক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক প্রয়োজনের বিচারে কোন বিকল্পটি সবচেয়ে উপযুক্ত, তা মূল্যায়ন করাও জরুরি।
ভারতকে টি-১৪ বিক্রির পিছনে রাশিয়ার কৌশল কী?
রাশিয়ার কাছে ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা সহযোগী এবং বড় সম্ভাব্য বাজার। ভারতের কাছে টি-১৪ বিক্রির প্রস্তাব দিয়ে রাশিয়া তার ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা প্রকল্পের জন্য নতুন ক্রেতা খুঁজতে, উৎপাদন বাড়াতে এবং যৌথ উন্নয়নের মাধ্যমে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করতে পারে।
ভারতের জন্যও এই প্রস্তাব সম্পূর্ণ অর্থহীন নয়। রাশিয়া যদি প্রযুক্তি হস্তান্তর, স্থানীয় উৎপাদন, ইঞ্জিনের দেশীয়করণ এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে বাস্তবসম্মত ও সুনির্দিষ্ট শর্তে সম্মত হয়, তাহলে প্রস্তাবটি বিবেচনা করা যেতে পারে।
তবে ইউক্রেন যুদ্ধে টি-১৪-এর সীমিত ব্যবহার, এর উচ্চ মূল্য এবং ব্যাপক উৎপাদনের চ্যালেঞ্জ ভারতকে সতর্ক থাকতে বাধ্য করছে।
সব মিলিয়ে, রাশিয়ার টি-১৪ প্রস্তাব ভারতের জন্য একটি সম্ভাবনাময় প্রযুক্তিগত সুযোগ হতে পারে। কিন্তু এই ট্যাঙ্ক কেনার সিদ্ধান্ত শুধু রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্কের ভিত্তিতে নেওয়া হবে না। ভারতীয় সেনাবাহিনীকে মূল্যায়ন করতে হবে, যুদ্ধক্ষেত্রে ট্যাঙ্কটি কতটা নির্ভরযোগ্য, কতটা সাশ্রয়ী মূল্যে পাওয়া সম্ভব এবং ভারতের আত্মনির্ভর প্রতিরক্ষা নীতিতে এর ভূমিকা কী হতে পারে।

About Author

Advertisement