১৩ হাজার রিসাইকেলড পেন দিয়ে তৈরি মা দুর্গার প্রতিমা, পুজোর পর আবার তৈরি হবে নতুন পেন

d0047dbb-0dcc-4352-812b-31087f4347a0

কলকাতা: সাধারণত লেখালেখির কাজে ব্যবহৃত পেন দিয়েও যে আকর্ষণীয় শিল্পকর্ম তৈরি করা সম্ভব, তারই উদাহরণ দেখা গেল ভারতের কলকাতায়। ভারতের লেখার সামগ্রী প্রস্তুতকারী সংস্থা লিঙ্ক লিমিটেডের ব্র্যান্ড ‘পেন্টোনিক’ পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি প্রায় ১৩ হাজার পেন এবং ১৩ হাজার রিফিল ব্যবহার করে মা দুর্গার একটি বিশেষ শিল্পকর্ম তৈরি করেছে।
কলকাতার ত্রিধারা সম্মিলনীতে প্রদর্শিত হতে চলা এই শিল্পকর্মটি তৈরি করেছেন বিশিষ্ট শিল্পী চন্দ্রনাথ সাহা (তিলক)। প্রায় ৫.৫ ফুট উঁচু, ৪.৫ ফুট চওড়া এবং ৩ ফুট গভীর এই শিল্পকর্ম দৈনন্দিন ব্যবহারের সাধারণ জিনিসকে সৃজনশীল উপায়ে পুনর্ব্যবহারের বার্তা দেয়।
প্রচলিত প্রতিমার বিসর্জন হবে, পেন দিয়ে তৈরি শিল্পকর্মের হবে পুনর্ব্যবহার
এই শিল্পকর্মটি ত্রিধারা সম্মিলনীর মূল দুর্গাপ্রতিমার পাশে রাখা হবে। এটি প্রচলিত দুর্গাপ্রতিমার বিকল্প নয়। ধর্মীয় রীতি মেনে মূল প্রতিমার বিসর্জন হবে। তবে পেন্টোনিক পেন দিয়ে তৈরি এই শিল্পকর্মের বিসর্জন হবে না।
দুর্গাপুজো শেষ হওয়ার পর শিল্পকর্মটি খুলে আলাদা করা হবে এবং এতে ব্যবহৃত উপকরণ পুনরায় প্রক্রিয়াজাত করা হবে। সংস্থার পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেই উপকরণ দিয়ে নতুন পেন তৈরি করা হবে। এর মাধ্যমে বার্তা দেওয়া হয়েছে যে প্লাস্টিকের তৈরি সামগ্রী একবার ব্যবহারের পর ফেলে না দিয়ে আবারও কাজে লাগানো সম্ভব।
শিল্পীর কাছে চ্যালেঞ্জ ছিল প্রতিমার ঐতিহ্যবাহী রূপ বজায় রাখা
সাধারণ পেনের মতো উপকরণ দিয়ে মা দুর্গার প্রতিমা তৈরি করা শিল্পী চন্দ্রনাথ সাহা (তিলক)-এর কাছে ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন উপকরণ ব্যবহার করার পাশাপাশি দেবীর প্রচলিত রূপ এবং তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আবেগ ও অনুভূতি বজায় রাখাও ছিল তাঁর অন্যতম লক্ষ্য।
সাহার কথায়, প্রতিদিনের ব্যবহারের পেন দিয়ে আর কী কী তৈরি করা যায়, সেই ভাবনা থেকেই এই প্রকল্পের সূচনা। হাজার হাজার পেন একসঙ্গে জুড়ে দেওয়ার ফলে সেগুলির চেহারা বদলে গিয়ে একটি বিশাল শিল্পকর্মের রূপ নিয়েছে।
তিনি জানান, তাঁর ইচ্ছা, দর্শকরা প্রথমে শিল্পকর্মটির সৌন্দর্য উপভোগ করবেন। তারপর তাঁদের মনে কৌতূহল তৈরি হবে—এটি আসলে কী কী উপকরণ দিয়ে তৈরি।
‘পেন থেকে শিল্পকর্ম, তারপর নতুন পণ্য তৈরির যাত্রা’
লিঙ্ক লিমিটেডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর দীপক জালান বলেন, পরিচিত জিনিসকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে মানুষকে উৎসাহিত করাই এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য।
তাঁর মতে, পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি ১৩ হাজার পেন্টোনিক পেন ব্যবহার করে মা দুর্গার শিল্পকর্ম নির্মাণ ডিজাইনের সৃজনশীল সম্ভাবনার একটি উদাহরণ। এই প্রকল্পের বিশেষত্ব শুধু শিল্পকর্মটির বিশাল আকার নয়, বরং পেনের সম্পূর্ণ যাত্রাপথ—লেখার উপকরণ থেকে শিল্পকর্ম এবং সেখান থেকে পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে নতুন পণ্যে রূপান্তর।
তিনি আরও বলেন, ঐতিহ্য ও নতুন ভাবনার সমন্বয় কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। দুর্গাপুজোর সময় শহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক মঞ্চে এই ভাবনা তুলে ধরার ফলে প্রকল্পটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
শিল্প, সংস্কৃতি ও পরিবেশ সচেতনতার মেলবন্ধন
ত্রিধারা সম্মিলনীতে প্রদর্শিত হতে চলা এই শিল্পকর্মের মাধ্যমে দুর্গাপুজোয় আসা বিপুলসংখ্যক দর্শকের কাছে পরিবেশ সংরক্ষণের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার আশা করা হচ্ছে। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসবের আবহে এই সৃষ্টি শিল্প, পণ্য নকশা এবং প্লাস্টিকের পুনর্ব্যবহারকে একসূত্রে যুক্ত করেছে।
ভারতের অন্যতম প্রধান লেখার সামগ্রী প্রস্তুতকারী সংস্থা লিঙ্ক লিমিটেডের পণ্য ৬০টিরও বেশি দেশে পাওয়া যায়। সংস্থাটি বলপেন, জেল পেন এবং অন্যান্য স্টেশনারি সামগ্রী তৈরি করে। সংস্থার দাবি, উদ্ভাবন, গুণমান এবং সাশ্রয়ী নকশার ওপর তারা বিশেষ গুরুত্ব দেয়।
১৩ হাজার পেন দিয়ে তৈরি মা দুর্গার এই শিল্পকর্মের বার্তা সহজ—দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ একটি জিনিসও সৃজনশীল চিন্তার মাধ্যমে অসাধারণ হয়ে উঠতে পারে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিল্পকর্ম তৈরির কাজ শেষ হলেও এতে ব্যবহৃত উপকরণের উপযোগিতা শেষ হবে না। সেগুলি পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ করে নতুন পেন তৈরি করা হবে।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্লাস্টিকের পুনর্ব্যবহার এবং প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহারের বিষয়ে মানুষকে সচেতন করার একটি অভিনব প্রচেষ্টা তুলে ধরা হয়েছে।

About Author

Advertisement