— দেবেন্দ্র কে ঢুঙ্গানা
ভারতের রাজধানী দিল্লিতে মণিপুরি গিটারবাদক ‘চোংথম বিক্রম’-এর হত্যা শুধুমাত্র একটি অপরাধমূলক ঘটনা নয়। এটি একবিংশ শতাব্দীর ভারতেও জীবিত জাতিগত বৈষম্যের একটি আয়না। সাতজনের গ্রেপ্তার আইনি প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে গেছে, কিন্তু প্রশ্ন এখনও রয়ে গেছে—একজন উত্তর-পূর্বের যুবককে কেন নিজের দেশেই নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করতে হলো?
১. সমসাময়িক প্রেক্ষাপট: ২০২৬ সালেও কেন একই গল্প?
বিক্রমের ঘটনা নতুন কিছু নয়। লোইতাম্বম রিচার্ড থেকে নিডো তানিয়া পর্যন্ত, দিল্লি, বেঙ্গালুরু এবং পুনেতে “চিঙ্কি” বলে অপমানিত হয়ে মারধরের শিকার হওয়া, বাড়ি ভাড়া না পাওয়া এবং রাতে বাইরে বেরোতে বাধা দেওয়ার ঘটনা বারবার ফিরে এসেছে।
২০২৬-এর ভারত ডিজিটাল, বৈশ্বিক। কিন্তু মহানগরগুলিতে উত্তর-পূর্বের কোনো মানুষের মুখ দেখলেই “তুমি কোথা থেকে এসেছ?”—এই প্রশ্নটিই এখনও প্রথমে করা হয়।
করোনার পরবর্তী সময়ে “বিদেশির মতো দেখতে” বলে উত্তর-পূর্বের মানুষের ওপর হামলা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জাতিগত বিদ্বেষমূলক ট্রোলিং এবং চাকরি ও বাড়ি ভাড়া নেওয়ার ক্ষেত্রে গোপন বৈষম্য—এসব কারণে বিক্রমের মৃত্যুকে শুধুমাত্র “ব্যক্তিগত বিবাদ” বলে দেখার সুযোগ নেই।
২. আজকের প্রভাব
আজকের মূল সমস্যা শুধু আইনের মধ্যে নয়, বরং “সামাজিক প্রেক্ষাপটের ব্যবধানের” মধ্যেও রয়েছে।
এর তিনটি প্রত্যক্ষ প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যায়:
ক. মানসিক বাস্তুচ্যুতি
হাজার হাজার উত্তর-পূর্বের শিক্ষার্থী, শিল্পী এবং নার্স দিল্লিতে পড়াশোনা ও কাজ করতে আসেন। কিন্তু প্রতিদিন “তুমি কি ভারতীয়?”—এরকম প্রশ্ন শুনতে শুনতে তাঁদের মধ্যে “দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক” হওয়ার অনুভূতি তৈরি হয়। বিক্রমের মৃত্যু সেই ভয়কেই আরও সত্যি করে তুলেছে।
খ. সাংস্কৃতিক দূরত্ব
ভারত “বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য”-র কথা বলে। কিন্তু মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্র, দিল্লির টেলিভিশন এবং স্কুলের পাঠ্যক্রমে উত্তর-পূর্ব ভারতের ইতিহাস, সঙ্গীত ও সাহিত্য প্রায় অনুপস্থিত।
অপরিচিতি থেকেই ভয়ের জন্ম হয়। আর ভয় থেকেই সহিংসতার জন্ম হয়।
বিক্রম একজন সঙ্গীতশিল্পী ছিলেন। সঙ্গীতের কাজ ছিল মানুষকে একত্রিত করা। কিন্তু যখন সঙ্গীতও মানুষকে একত্রিত করতে পারল না, তখন তাঁর সঙ্গীতই নীরব হয়ে গেল।
গ. প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা
পুলিশ মামলা দায়ের করতে পারে। কিন্তু “জাতিগত অপমান” বা “নস্লগত নিপীড়ন”-কে পৃথক অপরাধ হিসেবে নথিভুক্ত করার কার্যকর ব্যবস্থা নেই। ফলে এই সমস্যা পরিসংখ্যানের মধ্যে দৃশ্যমান হয় না। নীতি তৈরি হয় না, আর সমস্যাটিও অদৃশ্য থেকে যায়।
বাড়ির মালিক, এইচআর বিভাগ এবং কলেজ প্রশাসন—সবাই “এটা আমাদের দায়িত্ব নয়” বলে নিজেদের দায়িত্ব এড়িয়ে যায়।
৩. বিশ্লেষণ: সমাধান কোথায়?
বিক্রমকে ন্যায়বিচার দেওয়া মানে শুধু হত্যাকারীদের জেলে পাঠানো নয়।
প্রথমত, শিক্ষা: স্কুল পর্যায় থেকেই শুধু এটা শেখানো যথেষ্ট নয় যে সিকিম থেকে অরুণাচল প্রদেশ পর্যন্ত ভারতেরই অংশ। সেখানে বসবাসকারী মানুষের পোশাক, ভাষা, ইতিহাস এবং সংস্কৃতি সম্পর্কেও শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে।
দ্বিতীয়ত, আইন: “হেট ক্রাইম” এবং “জাতিগত বৈষম্য”-এর পৃথক আইনি সংজ্ঞা এবং কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা প্রয়োজন। পুলিশের জন্য সংবেদনশীলতা-বিষয়ক প্রশিক্ষণও বাধ্যতামূলক করা উচিত।
তৃতীয়ত, প্রতিনিধিত্ব: সংসদ থেকে গণমাধ্যম পর্যন্ত উত্তর-পূর্ব ভারতের কণ্ঠস্বর যথেষ্ট জোরালোভাবে না পৌঁছানো পর্যন্ত দিল্লি তাঁদের যন্ত্রণা পুরোপুরি বুঝতে পারবে না। বিক্রমের মতো শিল্পীদের মঞ্চ দরকার, সন্দেহ নয়।
মৃত্যুর প্রশ্ন
চোংথম বিক্রমের গিটার আর বাজবে না। কিন্তু তাঁর মৃত্যু একটি প্রশ্ন অত্যন্ত তীব্রভাবে আমাদের সামনে তুলে ধরেছে—৭৫ বছর পরেও কি ভারত তার নিজের নাগরিকদের সম্পূর্ণভাবে “আপন” করে নিতে পেরেছে?
যতদিন না কোনো উত্তর-পূর্বের তরুণী রাত ১২টায় দিল্লির মেট্রোতে নির্ভয়ে চলাফেরা করতে পারেন, যতদিন না কোনো মণিপুরি যুবককে বাড়ি ভাড়া নেওয়ার সময় “তোমাদের খাবার থেকে দুর্গন্ধ আসে”—এই কথা শুনতে হয়, ততদিন বিক্রমের মৃত্যু “সঙ্গীতের ঊর্ধ্বে” উঠে প্রতিটি ভারতীয়ের বিবেককে নাড়া দিতে থাকবে।
এই হত্যা শুধু একজন মানুষের হত্যা নয়। এটি ভারতের “ঐক্য”-র প্রতিশ্রুতির হত্যা। আর সেই প্রতিশ্রুতিকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের সকলের।





