কলকাতা: ভারত যখন জাতীয় শিক্ষানীতি (এনইপি) ২০২০-এর আলোকে শিক্ষাব্যবস্থার রূপান্তরের পথে এগিয়ে চলেছে, তখন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষাক্রমে ভারতের প্রাচীন জ্ঞান-ঐতিহ্যকে অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের দাবি।
চিন্ময় মিশনের ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ‘চিন্ময় অমৃত মহোৎসব’ উদযাপনের অংশ হিসেবে শনিবার কলকাতায় অনুষ্ঠিত হয় ‘আজকের অর্জুনদের জন্য—স্কুল ও কলেজে ভগবদ্গীতার জ্ঞান প্রবর্তন’ শীর্ষক স্বামী চিন্ময়ানন্দ স্মারক প্যানেল আলোচনা। মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে আগামী প্রজন্মের সার্বিক বিকাশের পথ সুগম করার লক্ষ্যে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাবিদ ও নীতি-নির্ধারকেরা অংশগ্রহণ করেন।
প্যানেল আলোচনায় সমসাময়িক শিক্ষাব্যবস্থায় ভগবদ্গীতার শাশ্বত জ্ঞানকে কীভাবে সর্বজনীন, বয়সোপযোগী এবং শিক্ষাগতভাবে প্রাসঙ্গিক উপায়ে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে, সে বিষয়ে অর্থবহ আলোচনা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পশ্চিমবঙ্গের অর্থমন্ত্রী শ্রী স্বপন দাশগুপ্ত বলেন, “ভগবদ্গীতা আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর অন্তর্নিহিত দর্শন, মূল্যবোধ এবং নির্ভীকতার যে শিক্ষা রয়েছে, তা অনুধাবন করা অত্যন্ত জরুরি। জাতি গঠনের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে এই নির্ভীকতার চেতনাকে সমাজে ছড়িয়ে দিতে হবে। আমার বিশ্বাস, মানুষের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই সঠিক মূল্যবোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন।”
আলোচনায় অংশ নেন দেশের কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের বিশিষ্ট আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব—রামকৃষ্ণ মিশনের আরকেএমভিইআরআই -এর প্রো-চ্যান্সেলর পূজ্য স্বামী আত্মপ্রিয়ানন্দজি, ভক্তিবেদান্ত রিসার্চ সেন্টার, কলকাতার ডিন আরাধ্য ভগবান দাস, এবং চিন্ময় মিশন (চেন্নাই ও উত্তর-পূর্ব ভারত)-এর প্রধান পূজ্য স্বামী মিত্রানন্দজি। আলোচনাটি সঞ্চালনা করেন চিন্ময় মিশন, নয়াদিল্লির স্বামী প্রকারশানন্দজি।আলোচকরা মত প্রকাশ করেন যে, ভগবদ্গীতার সর্বজনীন শিক্ষা বর্তমান প্রজন্মকে আধুনিক বিশ্বের নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে এটি তাদের মধ্যে নৈতিক নেতৃত্ব, মানসিক দৃঢ়তা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং উদ্দেশ্যপূর্ণ জীবনযাপনের মানসিকতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
এই উদ্যোগের অনুপ্রেরণা নিহিত রয়েছে পূজ্য গুরুদেব স্বামী চিন্ময়ানন্দজির সেই দূরদর্শী চিন্তায়, যার মাধ্যমে তিনি ভগবদ্গীতাকে কেবল ধর্মীয় গ্রন্থ হিসেবে নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের ব্যবহারিক পথনির্দেশিকা হিসেবে মানুষের সামনে তুলে ধরেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, আধ্যাত্মিকতা কেবল অধ্যয়নের বিষয় নয়; বরং তা জীবনচর্চার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হওয়ার বিষয়। তাঁর মতে, সমাজে স্থায়ী পরিবর্তনের সূচনা ঘটে ব্যক্তির আত্মরূপান্তরের মধ্য দিয়েই।
“ব্যক্তিগত রূপান্তরের মাধ্যমেই বিশ্বের মুক্তি নিহিত”-এই আদর্শকে সামনে রেখে চিন্ময় মিশন গত সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে এমন মানুষ গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করে চলেছে, যাদের মধ্যে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা, দক্ষতা ও চরিত্র, এবং সাফল্য ও উদ্দেশ্যের সুষম সমন্বয় বিদ্যমান। তাঁর এই দর্শন ভারতের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক নবজাগরণে নিবেদিত বহু প্রতিষ্ঠানের যৌথ প্রয়াসকে অনুপ্রাণিত করেছে এবং ভারতের শাশ্বত জ্ঞানকে বিশ্বব্যাপী পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
পূজ্য স্বামী মিত্রানন্দজি বলেন, “ভগবদ্গীতা পাঁচ হাজার বছর আগে যেমন প্রাসঙ্গিক ছিল, আজও তেমনই প্রাসঙ্গিক। এটি শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটায় এবং মানসিক দুর্বলতা ও চাপ অতিক্রম করতে সহায়তা করে। বর্তমান প্রজন্ম অভূতপূর্ব সুযোগের পাশাপাশি জটিল মানসিক, নৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। তাই শিক্ষাব্যবস্থাকে তাদের শুধু সফল পেশাজীবন নয়, অর্থবহ জীবনযাপনের জন্যও প্রস্তুত করতে হবে। ভগবদ্গীতার কর্মযোগ শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, পরীক্ষা ও পেশা নির্বাচনের ক্ষেত্রে এক কালজয়ী দিকনির্দেশনা প্রদান করে।”
ভগবদ্গীতার কর্মযোগ প্রসঙ্গে পূজ্য স্বামী আত্মপ্রিয়ানন্দজি বলেন, “শুধু লক্ষ্য অর্জনের পেছনে ছুটলেই হবে না; বরং বর্তমান কর্মে সর্বান্তকরণে মনোনিবেশ করতে হবে। তাহলেই কাঙ্ক্ষিত ফল স্বাভাবিকভাবেই আসবে।”
আলোচনায় এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়, যা কেবল শিক্ষাগত উৎকর্ষ নয়, বরং আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা, নৈতিক স্বচ্ছতা, মানসিক দৃঢ়তা এবং দায়িত্বশীল নাগরিকত্বের বিকাশ ঘটায়। বিকশিত ভারত গঠনের লক্ষ্যে এগিয়ে চলা ভারতের জন্য প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মূল্যবোধসম্পন্ন এবং দৃঢ় চরিত্রের নাগরিক গড়ে তোলাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ, এমন মত প্রকাশ করেন বক্তারা।
শিক্ষার্থীদের মানসিক দৃঢ়তা ও সুস্থতা প্রসঙ্গে আরাধ্য ভগবান দাস বলেন, “জীবনে মূল্যবান কিছু অর্জন সহজ নয়। নিজের সর্বোত্তম সংস্করণে পৌঁছাতে হলে কঠোর পরিশ্রম ও সংগ্রামের মধ্য দিয়েই এগোতে হবে।”
‘আজকের অর্জুনদের জন্য’ প্রতিপাদ্যটি ভগবদ্গীতার চিরন্তন প্রাসঙ্গিকতাকেই তুলে ধরে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্র ইতিহাসের অংশ হলেও, আজকের তরুণ-তরুণীদেরও অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ, নৈতিক দ্বিধা, সামাজিক চাপ এবং জীবনের উদ্দেশ্য অনুসন্ধানের মতো নানা সংগ্রামের মুখোমুখি হতে হয়। এই প্রেক্ষাপটে ভগবদ্গীতার শিক্ষা তাদের জন্য একটি কার্যকর দিশারি হতে পারে।
চিন্ময় মিশনের ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল শ্রী আর. এন. রবি এক ভিডিও বার্তায় বলেন, “বিশ্বজুড়ে বিদ্যমান বৈষম্য, বিভেদ ও সংঘাত দূর করে ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’-এর শাশ্বত আদর্শ প্রতিষ্ঠার পথে ভারত যখন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে চলেছে, তখন পূজ্য স্বামী চিন্ময়ানন্দজির শিক্ষা আমাদের জাতীয় লক্ষ্য অর্জনের পথে অনুপ্রেরণা ও পথনির্দেশ জোগাতে থাকবে।”
চিন্ময় মিশন সম্পর্কে
১৯৫১ সালে পূজ্য গুরুদেব স্বামী চিন্ময়ানন্দজি প্রতিষ্ঠিত চিন্ময় মিশন বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় আধ্যাত্মিক ও শিক্ষামূলক সংগঠন। বেদান্ত দর্শন এবং ভগবদ্গীতার সর্বজনীন জ্ঞান প্রচারের লক্ষ্যে ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিস্তৃত কেন্দ্র, বিদ্যালয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মসূচি, যুব কার্যক্রম এবং আধ্যাত্মিক উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি মানুষকে তাদের সর্বোচ্চ সম্ভাবনার বিকাশ ঘটাতে এবং সমাজে অর্থবহ অবদান রাখতে অনুপ্রাণিত করে আসছে। ‘ব্যক্তিগত রূপান্তরই জাতীয় ও বৈশ্বিক পরিবর্তনের ভিত্তি’-এই আদর্শকে ধারণ করে চিন্ময় মিশন গত সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে মূল্যবোধভিত্তিক নেতৃত্ব, সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস এবং আধ্যাত্মিক চেতনা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।










