দেবেন্দ্র কিশোর
ইরানের মানবাধিকার কর্মী নার্গিস মোহাম্মদী-এর জীবন শুধু ব্যক্তিগত সাহসিকতার গল্প নয়, বরং আধুনিক বিশ্ব রাজনীতিতে রাষ্ট্রক্ষমতা কীভাবে ভিন্নমত ও স্বাধীন চিন্তাকে দমন করে তার এক শক্তিশালী দলিল। বছরের পর বছর কারাবাস, নির্যাতন এবং মানসিক ও শারীরিক নিপীড়ন সহ্য করার পরও তিনি নিজের কণ্ঠস্বর থামাননি। তাই তাঁর সংগ্রাম শুধু ইরানের ভেতর সীমাবদ্ধ নয়; এটি আজ বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে ওঠা কণ্ঠগুলোর প্রতীক হয়ে উঠেছে।
২০২৩ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার ২০২৩ নার্গিস মোহাম্মদী-কে প্রদান করা হয়। কিন্তু তিনি নিজে পুরস্কার গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেননি, কারণ তখনও তিনি ইরানের কারাগারে বন্দি ছিলেন। তাঁর পরিবর্তে তাঁর যমজ সন্তানরা পুরস্কার গ্রহণ করে এবং মঞ্চে রাখা খালি চেয়ারটি এক গভীর বার্তা দেয়—রাষ্ট্র দেহকে বন্দি করতে পারে, কিন্তু চিন্তাকে নয়।
নার্গিস মোহাম্মদী-এর জীবন থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, ইরানে রাজনৈতিক ভিন্নমত কোনো সাধারণ অপরাধ নয়; বরং ক্ষমতাসীনদের কাছে তা “হুমকি” হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি নারীর অধিকার, মৃত্যুদণ্ডের অবসান, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি এবং ধর্মীয় স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে কণ্ঠ তুলেছিলেন। এই কারণেই তাঁকে ১৪ বারেরও বেশি গ্রেপ্তার করা হয়েছে, ৩১ বছরেরও বেশি কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং শত শত বেত্রাঘাতের শাস্তি ঘোষণা করা হয়েছে। একজন নারীর বিরুদ্ধে এমন আচরণ শুধু ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নয়; এটি নাগরিকদের আতঙ্কিত করে রাখার একটি রাজনৈতিক কৌশল।
ইরানি শাসকগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে “জাতীয় নিরাপত্তা”-র নামে সমালোচকদের দমন করে আসছে। নার্গিস মোহাম্মদী-এর বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপ সেই কাঠামোগত দমননীতিরই প্রতিচ্ছবি। বিশেষ করে নারীদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনগুলোকে ইরান তার আদর্শিক নিয়ন্ত্রণের প্রতি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেছে। মাহসা আমিনি-র পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর পর শুরু হওয়া উইমেন লাইফ ফ্রিডম আন্দোলন ইরানি শাসনের কঠোর চেহারাকে বিশ্বের সামনে উন্মোচন করে। কারাগারে থেকেও নার্গিস মোহাম্মদী সেই আন্দোলনের আদর্শিক প্রতীক হয়ে ওঠেন।
বিশ্ব রাজনীতিতে এই ঘটনার প্রভাব বহুমাত্রিক। প্রথমত, এটি মানবাধিকার প্রশ্নকে আবারও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে ইরানের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে আসছে, কিন্তু নার্গিস মোহাম্মদী নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার পর সেই সমালোচনা আরও জোরালো হয়েছে। এর ফলে ইরানের ওপর নৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ বেড়েছে।
দ্বিতীয়ত, এই ঘটনা বিশ্বজুড়ে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইরত নাগরিক আন্দোলনগুলোর জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে। আজ রাশিয়া থেকে মিয়ানমার, চীন থেকে আফগানিস্তান—যেখানেই রাষ্ট্র নাগরিক স্বাধীনতাকে সীমিত করছে, সেখানেই নার্গিস মোহাম্মদী-এর সংগ্রাম এক প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি দেখিয়েছেন, কারাবাস, নির্যাতন কিংবা মৃত্যুভয়ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে মুছে ফেলতে পারে না।
তৃতীয়ত, এই ঘটনা নারীদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনাকে আরও শক্তিশালী করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের মতো ঐতিহ্য ও ধর্মীয় কাঠামো দ্বারা প্রভাবিত সমাজে নারীরা গণতন্ত্র ও অধিকারের আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে পারে না—এই ধারণাকে নার্গিস মোহাম্মদী চ্যালেঞ্জ করেছেন। তিনি শুধু একজন নারী অধিকারকর্মী নন; তিনি রাজনৈতিক চেতনার এক কেন্দ্রীয় কণ্ঠে পরিণত হয়েছেন।
তবে এই ঘটনার আরেকটি দিকও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বশক্তিগুলো প্রায়ই মানবাধিকার প্রশ্নকে নিজেদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত করে দেখে। ইরানের সমালোচক অনেক শক্তিই আবার নিজেদের মিত্র রাষ্ট্রে সংঘটিত দমন-পীড়নের বিষয়ে নীরব থাকে। তাই নার্গিস মোহাম্মদী-এর প্রসঙ্গ শুধু ইরানি শাসনের সমালোচনা নয়; এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিদ্যমান দ্বৈত মানদণ্ডের বিরুদ্ধেও প্রশ্ন তোলে।
নার্গিস মোহাম্মদী-এর সংগ্রামের সবচেয়ে আবেগময় দিক হলো তাঁর ব্যক্তিগত জীবন। সন্তানদের থেকে বিচ্ছিন্নতা, পরিবার থেকে দূরে থাকা, দীর্ঘ কারাজীবন এবং অবনতিশীল স্বাস্থ্য পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি নিজের আন্দোলন ছাড়েননি। একজন মায়ের তার সন্তানদের সঙ্গে কাটানোর সময় কারাগারের কক্ষে কাটানো শুধু ব্যক্তিগত বেদনা নয়; এটি রাজনৈতিক দমনের এক অমানবিক রূপ। কিন্তু তিনি সেই বেদনাকেই প্রতিরোধের শক্তিতে রূপান্তরিত করেছেন।
আজকের বিশ্বে গণতন্ত্র শুধু নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত হয় না। নাগরিক স্বাধীনতা, মানবাধিকার এবং ভিন্নমতের প্রতি সম্মানই গণতন্ত্রের প্রকৃত মানদণ্ড। নার্গিস মোহাম্মদী-এর গল্প সেই মৌলিক প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত—রাষ্ট্র কি তার নাগরিকদের চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার রাখে? যদি না রাখে, তাহলে এখনও কেন বিশ্বের এত দেশে সমালোচকেরা কারাগারে বন্দি?
নার্গিস মোহাম্মদী-এর জীবন একটি গভীর সত্য উন্মোচন করে : স্বাধীনতার সংগ্রাম কখনো সহজ নয়। এর জন্য কারাবাস, নির্যাতন, একাকীত্ব এবং আত্মত্যাগ সহ্য করতে হয়। কিন্তু ইতিহাস এটাও দেখিয়েছে যে, দমন কখনো স্থায়ী হয় না। কোনো ক্ষমতাই চিন্তার চেয়ে বড় হতে পারে না। আজ কারাগারের অন্ধকারে বসে থাকা নার্গিস মোহাম্মদী আসলে বিশ্বজুড়ে স্বাধীনতার আলোর প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
তাই তাঁর গল্প শুধু ইরানের গল্প নয়; এটি বিশ্বের প্রতিটি মানুষের গল্প, যারা ন্যায়, স্বাধীনতা এবং মানব মর্যাদার জন্য সংগ্রাম করে চলেছে।










