স্বামী আত্মভোলানন্দ(পরিব্রাজক)
অপূর্ব সুন্দর ও মূল্যবান মানব জীবনে বৈশাখী পূর্ণিমার পবিত্র তিথিতেই গৌতম বুদ্ধের জন্মগ্রহণ ঘটে। আবার এই একই তিথিতে তিনি বুদ্ধত্ব জ্ঞান লাভ করেন। গৃহত্যাগের পর রাজকুমার সিদ্ধার্থ (পরবর্তীকালে যিনি বুদ্ধদেব নামে পরিচিত) সত্যের সন্ধানে প্রায় সাত বছর বন-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ান।
তিনি কঠোর তপস্যা সাধন করেন এবং অবশেষে বৈশাখী পূর্ণিমার দিনে বোধগয়ার বোধি বৃক্ষের নিচে বুদ্ধত্ব জ্ঞান লাভ করেন। জ্ঞানলাভের পর বুদ্ধ পায়েস গ্রহণ করে তাঁর ব্রতভঙ্গ করেন। সেই কারণেই বুদ্ধ পূর্ণিমায় পায়েস রান্না করা হয় এবং বুদ্ধদেবকে পায়েসের ভোগ নিবেদন করা হয়।
শুধু তাই নয়, বৈশাখী পূর্ণিমার দিনেই কুশীনগরে বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণ ঘটে। পঞ্জিকা অনুসারে ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের ১৭ই বৈশাখ, ইংরেজি পয়লা মে, শুক্রবার বুদ্ধ পূর্ণিমা পালিত হবে। ৩০শে এপ্রিল সন্ধ্যা ০৮টা ২৯ মিনিটে পূর্ণিমা তিথির সূচনা হবে এবং পয়লা মে রাত্রি ০৯টা ৩৯ মিনিট পর্যন্ত এই তিথি বিরাজ করবে।
বুদ্ধ পূর্ণিমা বা বৈশাখী পূর্ণিমা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম পবিত্র উৎসব। এই পুণ্য তিথি বুদ্ধের ত্রি-স্মৃতি বিজড়িত, এই দিনেই তাঁর জন্ম, বোধিলাভ এবং মহাপরিনির্বাণ সংঘটিত হয়। তাই এই তিথিকে অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয় এবং এদিন যে কোনো নতুন সূচনা বিশেষ মঙ্গলজনক বলে বিবেচিত হয়।
এই পবিত্র দিনে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা স্নান সেরে শুচি বস্ত্র পরিধান করে মন্দিরে গিয়ে বুদ্ধ বন্দনায় নিমগ্ন হন। ভক্তরা মন্দিরে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করেন, ফুলের মালা দিয়ে মন্দির সজ্জিত করেন এবং বুদ্ধের আরাধনায় আত্মনিয়োগ করেন। এছাড়াও এই দিনে পঞ্চশীল, অষ্টশীল গ্রহণ, সূত্র পাঠ, সূত্র শ্রবণ এবং সমবেত প্রার্থনার আয়োজন করা হয়।
গৌতম বুদ্ধের অমৃত বাণী মূলত অহিংসা, দয়া, জ্ঞান, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। তাঁর বাণী মানুষকে দুঃখের কারণ ও তার প্রতিকার সম্পর্কে সচেতন করে এবং জীবনের লক্ষ্য অর্জনে পথ দেখায়। তাঁর মূল শিক্ষা হলো অহিংসা, সাম্য, মৈত্রী ও প্রীতির মাধ্যমে সকলকে একত্রিত করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা।
এই ত্রি-স্মৃতি বিজড়িত তিথির গুরুত্ব অপরিসীম। বুদ্ধের জন্ম, বুদ্ধত্ব লাভ এবং মহাপরিনির্বাণ, এই তিনটি ঘটনাই বৈশাখী বা বুদ্ধ পূর্ণিমার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি সনাতন ধর্মেও এই দিনটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে, কারণ গৌতম বুদ্ধকে শ্রীবিষ্ণুর নবম অবতার হিসেবে মান্য করা হয়।
পরম্পরাগত বিশ্বাস অনুযায়ী পূর্ণিমা তিথিতে চন্দ্রকে অর্ঘ্য প্রদান করলে মানসিক শান্তি লাভ হয়। বুদ্ধ পূর্ণিমার দিনে পবিত্র নদীতে স্নান করে গৃহে সত্যনারায়ণ পূজা করা শুভ। সন্ধ্যাবেলায় চন্দ্রোদয়ের পর চাঁদকে দুধের অর্ঘ্য প্রদান করলে মন প্রশান্ত হয়।
অহিংসা, সাম্য, মৈত্রী ও প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠাই বুদ্ধের মূল বাণী। তাই আমাদের পৃথিবী হোক আরও সুন্দর, মানুষের সমাজ হোক আরও মানবিক, এবং আমাদের রাষ্ট্র হোক শুভ ও মঙ্গলময়।











