দেবেন্দ্র কে. ঢুংগানা
নয়াদিল্লি: ভারতীয় গোরখা সম্প্রদায়ের পরিচয়, সম্মান ও অধিকারের সঙ্গে যুক্ত গোরখাল্যান্ডের দাবি কোনো নতুন রাজনৈতিক বিষয় নয়; এর শিকড় ঔপনিবেশিক যুগ পর্যন্ত বিস্তৃত। দার্জিলিং অঞ্চল ১৯শ শতকে ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর এখানে বসবাসকারী নেপালি ভাষাভাষী গোরখারা ধীরে ধীরে তাদের স্বতন্ত্র পরিচয় ও প্রশাসনিক অধিকারের দাবি তুলতে শুরু করেন। ১৯০৭ সালে প্রথমবার একটি পৃথক প্রশাসনিক এককের দাবি উত্থাপিত হয়, যা পরবর্তীতে বিভিন্ন পর্যায়ে আন্দোলনের রূপ নেয়।
১৯৮০-এর দশকে সুভাষ ঘিসিংয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত আন্দোলন গোরখাল্যান্ড প্রশ্নকে জাতীয় স্তরে প্রতিষ্ঠিত করে। এর ফলস্বরূপ ১৯৮৮ সালে দার্জিলিং গোরখা হিল কাউন্সিল (ডিজিএইচসি) গঠিত হয়, কিন্তু এটি প্রত্যাশিত ক্ষমতা প্রদান করতে ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে ২০০৭ সালের পর বিমল গুরুংয়ের নেতৃত্বে আন্দোলন আবার জোরদার হয়, যা ২০১১ সালে গোরখাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (জিটিএ) গঠনের পথ প্রশস্ত করে। তবে জিটিএ-ও পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি, ফলে অসন্তোষ অব্যাহত থাকে।
এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে আলোচক নিয়োগের পদক্ষেপটি বোঝা উচিত। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিত্যানন্দ রায়ের মতে, আলোচক বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে সংলাপ করে সমাধানের একটি রোডম্যাপ প্রস্তুত করবেন। এটি সরকারের সক্রিয়তার ইঙ্গিত দেয়, তবে প্রশ্ন রয়ে যায়—এই উদ্যোগ কি পূর্ববর্তী প্রচেষ্টার তুলনায় ভিন্ন ও কার্যকর হবে?
অতীত অভিজ্ঞতা দেখায় যে গোরখাল্যান্ড প্রশ্ন শুধুমাত্র প্রশাসনিক পুনর্গঠনের বিষয় নয়; এটি পরিচয়, ভাষাগত অধিকার এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অনুপস্থিতি বা সীমিত অংশগ্রহণ সমস্যাটিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তাই কোনো স্থায়ী সমাধানের জন্য কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে স্পষ্ট সমঝোতা অপরিহার্য।
বিভিন্ন মহল থেকে প্রাপ্ত প্রতিক্রিয়া মিশ্র। কেউ কেউ আলোচক নিয়োগকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন, আবার অনেকে এটিকে সময়ক্ষেপণের কৌশল বা রাজনৈতিক চাল হিসেবে বিবেচনা করছেন, বিশেষ করে নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে। এই সংশয় দূর করতে হলে আলোচনার প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ফলপ্রসূ করতে হবে।
এখন মূল প্রশ্ন হলো—এই উদ্যোগ কি গোরখাল্যান্ডকে একটি সুস্পষ্ট দিশা দিতে পারবে? এর উত্তর নির্ভর করবে আলোচনার গুরুত্ব, সব পক্ষের অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। যদি আলোচনা শুধুমাত্র প্রতিবেদনে সীমাবদ্ধ না থেকে সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের বাস্তব সিদ্ধান্তে পরিণত হয়, তবে এটি একটি ঐতিহাসিক মোড় হয়ে উঠতে পারে। অন্যথায়, এটি পূর্ববর্তী প্রচেষ্টার মতোই অসম্পূর্ণ থেকে যাওয়ার ঝুঁকি বহন করবে।
পরিশেষে, গোরখাল্যান্ডের স্থায়ী সমাধানের জন্য কেবল প্রশাসনিক কাঠামো যথেষ্ট নয়; বরং আস্থা গড়ে তোলা, পরিচয়ের মর্যাদা রক্ষা এবং ন্যায্য অধিকারের নিশ্চয়তা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আলোচক নিয়োগ সেই দিকের একটি পদক্ষেপ—কিন্তু এটি কতটা এগোবে, তা ভবিষ্যতের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে।










