সুন্দর মূল্যবান মনুষ্য জীবনে হোলি-দোলযাত্রা

IMG-20260301-WA0073

স্বামী আত্মভোলানন্দ (পরিব্রাজক)

আমাদের অপূর্ব সুন্দর মূল্যবান মনুষ্য জীবনে সত্য সনাতন ধর্মে দোলযাত্রা বা হোলি হলো একটি জনপ্রিয় ধর্মীয় উৎসব, যা রঙের উৎসব নামেও পরিচিত। পৌরাণিক তথ্য অনুযায়ী সত্যযুগে হিরণ্যকশিপু নামে এক রাজা ছিলেন। যার ছেলের নাম ছিল প্রহ্লাদ। এক সময় হিরণ্যকশিপু দেবতাদের বরে বলীয়ান হয়ে নিজেকে সর্বশক্তিমান ঈশ্বর ভাবতে শুরু করেন। প্রজাদেরকে তাকে ঈশ্বর হিসেবে মানতে নির্দেশ দেন। নিজের বালক পুত্র প্রহ্লাদ পিতাকে ঈশ্বর বলে মানতে রাজী ছিল না। প্রহ্লাদ পালনকর্তা ভগবান বিষ্ণুর অনন্য ভক্ত হিসেবে খ্যাত ছিলেন। নিজের ছেলেই যদি তাকে ঈশ্বর বলে না মানে, তাহলে প্রজারা তাকে ঈশ্বর বলে মানবে কেনো ? তাই, হিরণ্যকশিপু অনেক বুঝিয়ে ছেলেকে ধর্মের পথ থেকে সরাতে না পেরে, নিজের ছেলেকে হত্যা করার জন্য নানাভাবে চেষ্টা করে ব্যর্থ হন।শেষ পর্যন্ত হিরণ্যকশিপুর বোন হোলিকা রাজাকে প্রস্তাব দেয়…! যে, বালক প্রহ্লাদকে হত্যা করার জন্য সে তাকে ধরে নিয়ে অগ্নিকুণ্ডে প্রবেশ করবে। যেহেতু হোলিকার উপর দেবতার এই বর ছিলো যে, আগুনে হোলিকার কোনো ক্ষতি হবে না। সেহেতু প্রহ্লাদ আগুনে পুড়ে মারা যাবে, কিন্তুর হোলিকার কোনো ক্ষতি হবে না। হোলিকার প্রস্তাব মতো রাজা হিরণ্যকশিপু সেই ব্যবস্থা করেন। কিন্তু, তাতেও প্রহ্লাদ বেঁচে গিয়ে হোলিকাই আগুনে পুড়ে মারা যায়। এরপর রাজা হিরণ্যকশিপু, তার বালক পুত্রকে বলেন, তোমার ভগবান যদি থেকে থাকে তাকে এই মূহুর্তে এখানে উপস্থিত হতে বল। আর তারপর দেখ, তাকে আমি কিভাবে হত্যা করি। হিরণ্যকশিপু এই কথা বলা মাত্র, সেখানে নৃসিংহ বা নরসিংহ রূপে ভগবান বিষ্ণু আবির্ভূত হন এবং হিরণ্যকশিপুকে হত্যা করেন।রাজ্যের প্রজারা, বালক প্রহ্লাদের এই ভগবান ভক্তি, অহঙ্কারী রাজার বিনাশ দেখে খুশিতে আপ্লুত হন। ধর্মপ্রাণ প্রহ্লাদই যে এখন তাদের রাজা, এই খুশিতে আপ্লুত হয়ে প্রজারা রং নিয়ে খেলা ও উৎসব শুরু করেন এবং রং উৎসবের আনন্দকে অনেকগুন বাড়িয়ে দেয়। হোলিকা এবং হিরণ্যকশিপুর বিনাশ একই দিনে বা একই ঘটনায় ঘটেছিলো বলে কালক্রমে এই রং খেলার নাম হোলিকা থেকে শুধু হোলিতে পরিণত হয়। এবং হোলির আগের দিন হোলিকাদহন প্রথামতো হয়। এই ঘটনার স্মরণে প্রতিবছর এই তিথিতে রং খেলা বা হোলি খেলা একটি উৎসবে পরিণত হয়। যুগের পর যুগ ধরে চলতে থাকে এবং এখনও চলছে।দোল পূর্ণিমা খুব শুভ বলে মনে করা হয়। এদিন রাধা-কৃষ্ণের পুজো করা হয় বিশেষত। বৈষ্ণব বিশ্বাস অনুযায়ী, দোল পূর্ণিমার দিন বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ আবির নিয়ে রাধিকা ও অন্যান্য গোপীনীদের সঙ্গে রং খেলায় মেতেছিলেন। অন্যদিকে দোলযাত্রা বা দোল মূলত বৈষ্ণব সমাজের উৎসব। এটি রাধা ও কৃষ্ণের শাশ্বত ও ঐশ্বরিক প্রেম উদযাপন করে। হোলিকা দহন অশুভ শক্তির বিপরীতে শুভের জয় নির্দেশিত করে। আবার এই তিথিতেই মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেব জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। একদিকে এই তিথিতে চৈতন্যদেব জন্মগ্রহন করে ছিলেন, অন্যদিকে এই তিথিতেই শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দাবন বাসীর সঙ্গে প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী রং খেলায় মেতেছিলেন, এই সব কিছু মিলিয়ে রং খেলার পাশাপাশি বৈষ্ণব সমাজ দোল উৎসব বা দোলযাত্রা উদযাপন করে। বাংলায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে শান্তিনিকেতনে দোলের উৎসব বা বসন্তোৎসব একটি বিশেষ ও জনপ্রিয় ঐতিহ্য। যেখানে রঙের উৎসবের সাথে ঋতু পরিবর্তন এবং প্রকৃতির সৌন্দর্য উদযাপন করা হয়। শান্তিনিকেতনে বসন্তোৎসবের একটি বিশেষত্ব হল এর মধ্যে ধর্মীয় অনুষঙ্গ না থাকার কারণে এটি সকলের জন্য উন্মুক্ত, এটি বসন্ত ঋতুর আগমন এবং প্রকৃতির নবজাগরণের এক আনন্দপূর্ণ উদযাপন। দোল পূর্ণিমা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে বিশেষ একটি দিন। এই দিন হোলি উৎসব বা দোলযাত্রা নামেও পরিচিত। দোলযাত্রা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে অতি পবিত্র। দোল পূর্ণিমা বা দোল উৎসব ফাল্গুনের পূর্ণিমায় ব্রজ অঞ্চল, রাজস্থান, বৃন্দাবন, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, গুজরাট, ওড়িশা, আসাম, ত্রিপুরা এবং বাংলায় মহা ধুমধাম সহকারে পালিত হয়। ২০২৬ সালে দোল উৎসব পালিত হবে ৩ মার্চ, মঙ্গলবার। আর হোলি ৪ মার্চ, বুধবার। ওঁ গুরু কৃপাহি কেবলম।

About Author

Advertisement