থমাস লিওনের হাতে নির্মিত রাইটার্স বিল্ডিং: এক অনন্য নস্টালজিয়া

Screenshot_20260207_155231_Chrome

বেবি চক্রবর্ত্তী

প্রায় ২০০ বছর এর ব্রিটিশ শাসনের পর কোটি কোটি বাঙালির স্মৃতি বিজড়িত এই স্থানগুলি দর্শকদের মধ্যে রোমাঞ্চকর বা নস্টালজিক অনুভূতি এনে দেয় অন্তরে। বিবিডি বাগের লালদিঘির উত্তর প্রান্ত বরাবর ১৫০ মিটার দীর্ঘ এই ভবনের ১৭৭৭ সালে গোড়াপত্তন হয়। এটির স্থপতি ছিলেন একজন ব্রিটিশ, নাম থমাস লিওন। ২০০ বছর ধরে এই ভবনটির অভ্যন্তরে অনেক সংযোজন হয়েছে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন ধীরে ধীরে তার রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি ঘটাচ্ছিল তখন তাদের কর প্রক্রিয়াকে সুসংবদ্ধ করার জন্য একটি প্রশাসনিক ভবনের প্রয়োজন পড়ে। এখানে করণিকদের বসবাস ও কাজের স্থান হিসাবে এই ভবনটি নির্মিত হয়। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে পরাজিত করার পর তাদের সদর দপ্তর হিসাবে এই ভবনটি ব্যবহৃত হয় এবং পরবর্তীতে ভারতব্যাপী ব্রিটিশ রাজত্বের সদর দপ্তর হিসাবে পরিগণিত হয়। ২০০ বছরের অধিক কাল ধরে ব্রিটিশ শক্তির কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই মহাকরণ। ১৯৪৭ সালে স্বাধীন ভারতের অঙ্গরাজ্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মূল প্রশাসনিক ভবন হিসাবে মর্যাদার শিখরে মহাকরণ বিরাজ করে। এই ঐতিহ্যপূর্ণ ভবনটি বহু রাজনৈতিক বিদ্রোহ, বিক্ষোভ, গনহিংসা ও রাজনৈতিক নির্মমতার সাক্ষ্য বহন করে। সময়ের প্রবাহে ক্যালকাটা, কলিকাতা ও পরবর্তীতে কলকাতা শহরের প্রাণকেন্দ্রে এই ভবনটি ফোর্ট উইলিয়ামের মূল জমির উপর গড়ে ওঠে। ১৭৫৬ সাল পর্যন্ত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মিলিটারি বেশ ছিল এই জমিটিতে। এখানে কেবলমাত্র ইংরেজ ব্যবসায়ীরা তাদের দপ্তর খোলার অধিকার পেতো বলে একে শ্বেত-নগরী বলা হতো। ১৭৭৭- ৮০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রাইটার্স বিল্ডিং এর মাথার উপর রুশদেবী মিনার্ভার মূর্তিটি সংস্থাপিত হয়েছে। থমাস লিওন ইংল্যান্ডে ছিলেন একজন ছুতোর মিস্ত্রি। ভারতে রিচার্ড বারওয়েলের অধীনে তিনি এই ভবনটি তৈরীর দায়িত্ব পেয়েছিলেন। ফোর্ট উইলিয়াম রেসিডেন্সির গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস এই প্রকল্পটির তত্ত্বাবধান করেছিলেন। ৩৭ ৮৫০ স্কয়ার ফিটের ভবনটি ১৭৮০ সালে সমাপ্ত হয়। এরপর নানা প্রয়োজনে ভবনটি বিভিন্নভাবে পরিবর্তিত হয়। ভবনটি নির্মিত হওয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই করণিকদের পার্সি এবং হিন্দি ভাষায় শিক্ষিত করে তুলতে এর অভ্যন্তরে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ তৈরি করা হয়। এই দুটি ভাষাও ইংরেজি ছাড়া সরকারি যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতো। কলেজের প্রয়োজনে মূল ভবনটির সঙ্গে হোস্টেল ও পরীক্ষার হল তৈরি হয়। সঙ্গে বিভিন্ন ভাষা শিক্ষার শ্রেণীকক্ষ তৈরি করা হয়েছিল এই ত্রিতল ভবনটির দ্বিতীয় এবং তৃতীয় তলার সঙ্গে ১২৮ ফুট লম্বা বারান্দা সুদৃশ্য কলাম সহযোগে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে প্রশাসনিক মতদ্বৈততায় কলেজটি মহাকরণের অভ্যন্তরে বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। উনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী যখন কলিকাতা পনেরটি ব্লক সংযুক্ত হয়। প্রত্যেকটি থেকে অন্যটিতে যাওয়া যেতো সহজেই। পোর্টিকোগুলিতে গ্রিক দেবদেবীর মূর্তি স্থাপিত হয়। বিচার, বাণিজ্য, বিজ্ঞান ও কৃষিকে এই চার দেব-দেবী প্রতিনিধিত্ব করে। এই দেবদেবীরা হলেন জিউস, হেরমেস, অ্যাথিনা এবং ডিমিটার। রুশদেবী মিনার্ভা কেন্দ্রীয় পোর্টিকোর উপর অধিষ্ঠিত থেকে সকল দর্শকদের দৃষ্টিগোচর হয়। ১৯৩০ সালে কুখ্যাত আই জি এন এস সিম্পশনকে বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত ও দীনেশ গুপ্ত বাংলা স্বেচ্ছাসেবক গুপ্ত সমিতির সদস্য ত্রয়ী গুলি চালিয়ে হত্যা করেন। তারা সাময়িক এই ভবনের দখল নিয়ে ব্রিটিশ পুলিশের সঙ্গে গুলির লড়াই চালিয়ে যান। যখন তারা বুঝতে পারলেন, বিরাট পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে অসম লড়াই চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, বাদল পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে শহীদের মৃত্যুবরণ করেন। বিনয় ও দীনেশ মৃত্যুর জন্য নিজেদের গুলি চালান। পাঁচ দিন পরে হাসপাতালে বিনয় প্রাণত্যাগ করেন; দিনেশ বেঁচে যান ও পরে বিচারে ১৯৩১ সালের ৭ই জুলাই তার ফাঁসি হয়। এই তিন শহীদের নামে ডালহৌসি স্কোয়ার বিবিডি বাগ হিসাবে উৎসর্গীকৃত। এই তিনজনের মর্মরমূর্তি রাইটার্স বিল্ডিংয়ের সামনে প্রতিষ্ঠিত আছে। ১৯৪৭ সালের পর বিধান রায়, প্রফুল্ল সেন, সিদ্ধার্থ শংকর রায় কংগ্রেস সরকারের পক্ষে মুখ্যমন্ত্রীত্ব করেছেন। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় এলে কমিউনিস্ট মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু ও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ২০১১ সাল পর্যন্ত ৩৪ বছর এই মহাকরণ থেকে শাসনকার্য চালিয়েছেন।

২০১১ সালে মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে ২০১৩ সালে সাময়িকভাবে মুখ্যমন্ত্রী, সকল ক্যাবিনেট মন্ত্রী ও বহু উচ্চপদস্থ আমলার দপ্তর হুগলি নদীর তীরে পূর্বতন সরকারের আমলে তৈরি হুগলি রিভার ব্রিজ কমিশনারের অফিস হাওড়া শহরের নবান্নে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। মহাকরণের হেরিটেজ ভবনটি দুই বিলিয়ন (দুশত কোটি) টাকা খরচে সংস্কার ও মেরামতের প্রকল্প গৃহীত হয়। এখনো কিছু কিছু দপ্তর এই ভবনে আছে। পুরোপুরি সংস্কার কাজ সম্পূর্ণ হয়নি। এখনো বাঙালি মাত্রই এই ভবনটির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় স্মৃতিমেদুরতায় আচ্ছন্ন হয়ে ইতিহাসের অতীত ঘটনাবলিতে হৃদয় আবহগাহন করে আজও।

About Author

Advertisement