বেবি চক্রবর্তী
কলকাতার হৃদয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই অনন্য স্থাপত্য কেবল ইট–পাথরের নির্মাণ নয়, এটি সময়ের সঙ্গে বয়ে চলা এক নীরব ইতিহাসকথা। বি.বি.ডি. বাগ অঞ্চলের কেন্দ্রে অবস্থিত কলকাতা জেনারেল পোস্ট অফিস (জিপিও) আজও শহরের প্রশাসনিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের সাক্ষী হয়ে আছে।
ব্রিটিশ শাসনামলে ১৭৭৪ সালে যখন কলকাতা ভারতের রাজধানীর মর্যাদা পায়, তখন ডাক পরিষেবার প্রয়োজন নতুন মাত্রা লাভ করে। প্রাথমিকভাবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রশাসনিক চিঠিপত্রের আদান–প্রদানের জন্য স্থাপিত হলেও, ধীরে ধীরে এই ডাকঘর সাধারণ মানুষের যোগাযোগের প্রধান ভরসায় পরিণত হয়।
বর্তমান জিপিও ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৮৬৪ সালে এবং শেষ হয় ১৮৬৮ সালে। ব্রিটিশ স্থপতি ওয়াল্টার বি. গ্রেনভিল-এর নকশায় নির্মিত এই ভবনটি ক্লাসিক্যাল গ্রিক–রোমান স্থাপত্যশৈলীতে গড়ে তোলা। বিশাল গম্বুজ, সুউচ্চ স্তম্ভ ও বিস্তৃত প্রাঙ্গণ আজও শহরের স্থাপত্য ঐতিহ্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বিশেষজ্ঞদের মতে, লন্ডনের সেন্ট পলস ক্যাথেড্রাল থেকে অনুপ্রাণিত এই গম্বুজ কলকাতার আকাশরেখায় এক স্বতন্ত্র পরিচয় এনে দিয়েছে।
ঔপনিবেশিক আমলে কলকাতা জিপিও কেবল শহরের নয়, সমগ্র এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ ডাককেন্দ্র ছিল। এখান থেকেই বাংলা, বিহার, ওড়িশা এবং উত্তর–পূর্ব ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ডাকব্যবস্থা নিয়ন্ত্রিত হতো। বাণিজ্য, প্রশাসন ও সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রতিটি স্তরে এই ডাকঘরের ভূমিকা ছিল অপরিসীম।
এই ভবনের করিডোর দিয়ে হেঁটে গেছেন ব্রিটিশ অফিসার, ভারতীয় কর্মচারী, ব্যবসায়ী, লেখক ও সাধারণ মানুষ। অগণিত চিঠি সমুদ্র ও স্থলপথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছেছে, কখনও ক্ষমতা ও নির্দেশের বার্তা নিয়ে, কখনও মায়ের কপালে হাত রাখার আকুল অনুভূতি বহন করে।
কলকাতা জিপিও কেবল শাসনের যন্ত্র ছিল না; এটি প্রতিরোধের নীরব সহচরও ছিল। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় বহু বিপ্লবী বার্তা, সাংকেতিক চিঠি ও গোপন যোগাযোগ এই ডাকব্যবস্থার পথ ধরেই চলেছে। ব্রিটিশ নজরদারির মাঝেও ডাকঘর হয়ে উঠেছিল মতপ্রকাশের এক গোপন আশ্রয়। অনেক চিঠি হয়তো গন্তব্যে পৌঁছায়নি, বহু শব্দ সময়ের গর্ভে হারিয়ে গেছে—তবু সেই অদৃশ্য ইতিহাস আজও বাতাসে ভাসে।
১৯৪৭ এর পর স্বাধীন ভারতের নাগরিক পরিষেবার অংশ হিসেবে কলকাতা জিপিও নতুন ভূমিকা গ্রহণ করে। চিঠির সঙ্গে যুক্ত হয় মানি অর্ডার, সঞ্চয় প্রকল্প, পোস্টাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স ও আধুনিক ব্যাংকিং পরিষেবা। ধীরে ধীরে ডাকঘর হয়ে ওঠে আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তার এক নির্ভরযোগ্য কেন্দ্র।
ডিজিটাল যুগে ইমেল ও মোবাইল বার্তার প্রভাবে চিঠি লেখার রীতি কমলেও, কলকাতা জিপিও আজও প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের যাতায়াতে মুখর। এখানে আজও কেউ লাইনে দাঁড়িয়ে শেষ চিঠি পাঠায়, কেউ বহু বছরের সঞ্চয় হিসেবের বিবরণ খোলে।
শহরের বদলে যাওয়া মুখের মাঝেও কলকাতা জিপিও অটল। তার দেয়ালে জমে আছে শতাব্দীর ধুলো, গম্বুজে আটকে আছে অসংখ্য না বলা কথা। তাই এই ডাকঘর কেবল যোগাযোগের কেন্দ্র নয় এ এক জীবন্ত ইতিহাস, যেখানে প্রতিটি ইটের ফাঁকে লুকিয়ে আছে মানুষের গল্প।
যতদিন এই শহর থাকবে, ততদিন তার হৃদয়ের এক কোণে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকবে কলকাতা জেনারেল পোস্ট অফিস—চিঠির শহরের অটল ঠিকানা।

সময় বদলায়, যোগাযোগের মাধ্যম বদলায়, শহরের চেহারাও নিরন্তর রূপান্তরিত হয়। তবু কলকাতার বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এই জেনারেল পোস্ট অফিস আজও প্রমাণ করে, কিছু প্রতিষ্ঠান কেবল ব্যবস্থার অংশ নয়, তারা সভ্যতার স্মৃতিভাণ্ডার। ই–মেল ও ডিজিটাল বার্তার যুগেও এই ঐতিহাসিক ডাকঘর মানুষের অপেক্ষা, বিশ্বাস ও সম্পর্কের সাক্ষী হয়ে রয়েছে। তার স্তম্ভে জমে থাকা ধুলো, গম্বুজে আটকে থাকা নীরবতা আর করিডোরে প্রতিধ্বনিত অসংখ্য পায়ের শব্দ মিলিয়ে কলকাতা জিপিও আজও এক জীবন্ত ইতিহাস। যতদিন মানুষের হৃদয়ে চিঠির উষ্ণতা ও স্মৃতির টান থাকবে, ততদিন শহরের অন্তঃশিরায় নীরবে বয়ে চলবে এই ডাকঘরের অবিনশ্বর গল্প।











