নয়াদিল্লি: ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়ন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিটি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আর্থিক কূটনীতিতে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। এই চুক্তি লক্ষ লক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, ভারতের যুবক ও কৃষকদের জন্য ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং সম্মিলিতভাবে বিশ্ব অর্থনীতির এক-চতুর্থাংশের প্রতিনিধিত্বকারী প্রায় ২০০ কোটি মানুষের জন্য সম্পদ সৃষ্টি করবে।বিশ্বের দ্বিতীয় ও চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিটি এ যাবৎকালের মধ্যে বৃহত্তম বাণিজ্য চুক্তিগুলির অন্যতম। বস্তুতপক্ষে, এটি একটি সাধারণ বাণিজ্য চুক্তির চেয়ে অনেক বেশি কিছু। এটি একটি সর্বাত্মক অংশীদারিত্বের চুক্তি, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রতিরক্ষা এবং সেমিকন্ডাক্টরের মত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিতে সহযোগিতার পথ প্রশস্ত করবে। এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে ভারতের প্রতিটি অঞ্চল এবং নাগরিকরা, বিশেষত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মানুষরা উপকৃত হবেন। এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিটি নিয়মভিত্তিক বাণিজ্য এবং আর্থিক নীতিতে সুস্থিতিশীলতা সুনিশ্চিত করবে। পাশাপাশি, ভারতকে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগের আরও আকর্ষণীয় গন্তব্য করে তুলবে। ক্ষুদ্র ব্যবসা, স্টার্টআপ এবং কর্মীদের জন্য অসংখ্য সুযোগ তৈরি করবে এই চুক্তি।প্রধানমন্ত্রী মোদীর এই ঘোষণাকে সাধুবাদ জানিয়েছে গোটা বিশ্ব এবং এটিকে ‘সব চুক্তির সেরা চুক্তি’ হিসেবে অভিহিত করেছে। বিশ্বজুড়ে অনিশ্চয়তার এই সময়ে এই চুক্তি স্থিতিশীলতাকে মজবুত করবে। এই চুক্তিটি ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে উন্মুক্ত বাজার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অগ্রগতির প্রতি দৃঢ় সংকল্প বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।বাণিজ্যিক দিক থেকে ভারতের ৯৯ শতাংশেরও বেশি পণ্যের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নে নজিরবিহীন বাজার সুবিধা সুনিশ্চিত হয়েছে, যা ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগে আরও গতি আনবে। এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিটি বস্ত্র, চামড়া, জুতো, সামুদ্রিক পণ্য, রত্ন ও গয়না, হস্তশিল্প, কারিগরি পণ্য এবং গাড়ি শিল্পের মতো শ্রম-নিবিড় ক্ষেত্রগুলিতে নির্ণায়ক পরিবর্তন আনবে।এটি প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ভারতীয় রপ্তানি পণ্যের ওপর আরোপিত ১০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক হ্রাস করবে। এই চুক্তিটি শ্রমিক, কারিগর, মহিলা, যুবক এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলির ভিত্তি মজবুত করবে, পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মূল্য-ব্যবস্থায় ভারতীয় ব্যবসা-বাণিজ্যকে আরও গভীরভাবে সুসংহত করবে এবং বিশ্ব বাণিজ্যে একটি প্রধান সরবরাহকারী দেশ হিসেবে ভারতের ভূমিকাকে আরও শক্তিশালী করবে।এই চুক্তিটি ব্যবসায়ী ও পেশাদারদের যাতায়াতকে আরও সহজ করবে। সেইসঙ্গে শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি, আর্থিক পরিষেবা এবং কম্পিউটারের মতো ক্ষেত্রগুলিতে নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে। এর ফলে, উচ্চমানের কর্মসংস্থানের পথ খুলে যাবে এবং মেধা, উদ্ভাবন ও সুস্থায়ী অর্থনৈতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে একটি আন্তর্জাতিক কেন্দ্র হিসেবে ভারতের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে।বাণিজ্য চুক্তিগুলি দরিদ্রদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের জন্য মোদী সরকারের বৃহত্তর কৌশলের একটি অংশ। প্রথমে যুগান্তকারী সংস্কার এবং বিচক্ষণ আর্থিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা এবং তারপর একটি পারস্পরিক লাভজনক চুক্তির লক্ষ্যে উন্নত ও পরিপূরক অর্থনীতির দেশগুলির সঙ্গে বোঝাপড়ায় পৌঁছনো। এই পন্থা ভারতকে তার অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক ব্যবস্থাকে কাজে লাগাতে এবং শ্রম-নিবিড় ক্ষেত্রগুলির বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলিতে প্রবেশ করার পথ সহজ করবে। একইসঙ্গে, কৃষি ও দুগ্ধ শিল্পের মতো স্পর্শকাতর ক্ষেত্রগুলিকে সুরক্ষিত রাখবে।উন্নত দেশগুলির সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিগুলি ভারতীয় শিল্পের সামনে সুস্থ প্রতিযোগিতার পথ খুলে দিয়েছে এবং ক্রেতাদের বিশ্বমানের পণ্য সরবরাহ সুনিশ্চিত করেছে। ইউপিএ সরকারের মতো বেপরোয়াভাবে ভারতের বাজার খুলে না দিয়ে, মোদী সরকার এমন সব চুক্তি করেছে, যেখানে পর্যায়ক্রমে শুল্ক কমতে থাকবে। উপযুক্ত নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে আরও প্রতিযোগিতামুখী এবং পণ্যের গুণগতমান উন্নত করার পর্যাপ্ত সময় পাবে শিল্পমহল। প্রধানমন্ত্রীর বিকশিত ভারত – ২০৪৭ ভিশনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে উচ্চমানের পণ্য সরবরাহ। গত সপ্তাহে এই অঙ্গীকারের পুনরাবৃত্তি করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন: “আসুন, এই বছর আমরা সর্বশক্তি দিয়ে গুণমানকে অগ্রাধিকার দিই। আমাদের একমাত্র মন্ত্র হোক – গুণমান, গুণমান এবং কেবলই গুণমান। গতকালের চেয়ে আজ আরও ভালো গুণমান। আমরা যা কিছুই উৎপাদন করি না কেন, তার গুণমান যেন উন্নত করার সংকল্প গ্রহণ করি।ভারত-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিটি ভারতকে একটি উন্নত দেশে পরিণত করার প্রধানমন্ত্রী মোদীর স্বপ্নের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি বিশ্বের আঙিনায় ভারতকে একটি গতিশীল, বিশ্বস্ত এবং দূরদর্শী অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে, যা উভয় অঞ্চলের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক, সুস্থিতিশীল এবং ভবিষ্যৎ-উপযোগী অগ্রগতির ভিত্তি গড়ে দেবে। মোদী সরকার শুধুমাত্র সেইসব উন্নত দেশের সঙ্গেই বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন করেছে, ভারতের বস্ত্র, জুতো, রত্নালঙ্কার এবং হস্তশিল্পের মতো প্রধান কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিকারী ক্ষেত্রগুলির সঙ্গে যাদের কোনোরকম প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই। এটি ইউপিএ সরকারের অবস্থানের পুরোপুরি বিপরীত। ইউপিএ সরকার প্রতিযোগী অর্থনীতির দেশগুলির সঙ্গে চুক্তিতে তাড়াহুড়ো করেছিল এবং প্রায়ই ভারতের লাভের চেয়ে অনেক বেশি ছাড় দিয়েছিল।এছাড়া, ইউপিএ সরকার বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের আগে সংশ্লিষ্ট সবপক্ষের সঙ্গে ফলপ্রসূ শলাপরামর্শ করেছিল, এমন কোনও প্রমাণ নেই। এর বিপরীতে, মোদী সরকার অর্থনীতিবিদ, শিল্প সংস্থা, বিশেষজ্ঞ এবং একাধিক সরকারি দফতর ও মন্ত্রকের সঙ্গে সর্বাত্মক আলোচনার পরেই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। ফলস্বরূপ, মোদী সরকারের স্বাক্ষরিত প্রতিটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি শিল্পমহল থেকে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। মোদী সরকারের প্রতিটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি উভয় পক্ষের জন্য নতুন নতুন সুযোগ তৈরি করেছে এবং ভারতের শ্রম-নিবিড় ক্ষেত্রগুলির জন্য বিশ্বে সুযোগ প্রসারিত করেছে। এই চুক্তিগুলি ২০৪৭ সালের মধ্যে একটি উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার পথে ভারতের যাত্রাকে ত্বরান্বিত করেছে।ইউপিএ-র শাসনকালে মন্থর অর্থনৈতিক অগ্রগতির হার, অত্যধিক মূদ্রাস্ফীতি এবং হীন ব্যবসায়িক মানসিকতার কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সহ উন্নত দেশগুলি ভারতের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল। ভারত এমন লাভজনক বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করার মূল্যবান সুযোগ হাতছাড়া করেছিল, যা অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করতে পারত এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারত। মোদী সরকারের সম্পাদিত অন্যান্য বাণিজ্য চুক্তিগুলির পাশাপাশি ভারত-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিটি অক্ষম ও দৃঢ় নেতৃত্বের মধ্যে পার্থক্যের বার্তা দেয়। পূর্ববর্তী সরকারগুলি যখন দ্বিধাগ্রস্ত ছিল এবং আপসের পথ বেছে নিয়েছিল, তখন মোদী সরকার এমন একটি যুগান্তকারী চুক্তি সম্পন্ন করেছে, যা বাজারের ব্যাপ্তি ঘটাবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং ভারতের স্বার্থ রক্ষা করবে। কীভাবে শক্তিশালী নেতৃত্ব এবং কৌশলগত স্বচ্ছতা নতুন সুযোগের পথ খুলে দিতে পারে এবং দেশকে সমৃদ্ধির পথে চালিত করতে পারে, এই চুক্তি হল তার সুস্পষ্ট প্রমাণ।








