সিলিগুড়ি/ব্যারাকপুর: উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম দেশে অধিকাংশ রাজ্য আপাতত পদ্মবনে ভরা। দিকে দিকে উড়েছে গেরুয়া নিশান। দেশের ২১ রাজ্য এখন বিজেপি শাসিত। এত সাফল্য সত্ত্বেও তৃপ্ত নয় কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন দল। তাদের পাখির চোখ বাংলা। এ রাজ্যের দখল নিতে না পারলে অভিপ্রেত সন্তুষ্টি অধরাই থেকে যাবে মোদি-শাহর। শনিবার শিলিগুড়ির জনসভা থেকে সেকথা একেবারে স্পষ্ট করে দিলেন অমিত শাহ। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথায়, ”২১ টি রাজ্যে আমাদের সরকার আছে। তা সত্ত্বেও খুশি নন মোদি। বাংলায় সরকার গড়তে পারলেই সোনালি সাফল্য আসবে।” ছাব্বিশে অবশ্য বঙ্গদখল নিয়ে আত্মবিশ্বাসী শাহ। বললেন, ”মমতা সরকারের বিদায় হবেই।”আজ নয়, দীর্ঘদিন ধরে বিজেপির চোখে ‘সোনার বাংলা’র ক্ষমতা পাওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু দুর্বল সংগঠন, বাঙালিয়ানা থেকে দূরত্বের মতো বহু ইস্যুর কারণে তাদের সেই স্বপ্ন অধরা রয়ে গিয়েছে। একুশের বিধানসভা ভোটের প্রচারে এসে অমিত শাহর বারবার স্লোগান তুলেছিলেন ‘আব কি বার/২০০ পার।’ সেবার ৭৭-এ আটকে গিয়েছিল দু’শো পেরনোর স্বপ্ন। চব্বিশের লোকসভা ভোটে বাংলা থেকে আরও ধাক্কা খেয়েছে গেরুয়া শিবির। উনিশের তুলনায় সাংসদ সংখ্যা কমেছে। অন্যদিকে, ঘাসফুল শিবির তরতরিয়ে বেড়ে জাতীয় রাজনীতিতে ফের দাপট দেখিয়েছে। এবার সামনে ছাব্বিশের নির্বাচন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের চতুর্থবার ফেরা নিয়ে সংশয় নেই রাজনৈতিক মহলের একটা বড় অংশেরই। আর এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে অমিত শাহ বললেন উলটো কথা। বারাকপুর থেকে শিলিগুড়ি, কর্মিসভায় শাহর দাবি, বর্তমান সরকারের দুর্নীতিতে মানুষের প্রাণ ওষ্ঠাগত। মহিলা মুখ্যমন্ত্রীর রাজ্যে মহিলারাই সুরক্ষিত নন। আর তাই এবার মমতা সরকারকে বিদায় করার সময় আসন্ন। ছাব্বিশের ভোটেই তাঁর বিদায় হবে। তাঁর কথায়, ”আপনার (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের) টা টা বাই বাই-এর সময় এসে গিয়েছে। এই বছরের এপ্রিলের শেষে আপনাকে বিদায় নিতে হবে।” সেইসঙ্গে ‘শাহী’ প্রতিশ্রুতি, বিজেপি ক্ষমতায় এলে আনন্দপুর অগ্নিকাণ্ডে দোষীদের দ্রুত শাস্তি দেওয়া হবে, ৪৫ দিনের মধ্যে অরক্ষিত সীমান্তে বসবে কাঁটাতার, পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে অনুপ্রবেশ। চলতি বছর বাংলায় বিধানসভা নির্বাচন । এবার বাংলায় সরকার গড়বে বিজেপিই। বারাকপুরের সভা থেকে বিজেপি কর্মীদের টার্গেট বেঁধে দিলেন অমিত শাহ। বাংলায় এবার ৪৫ শতাংশের বেশি ভোট বিজেপিকে পেতে হবে। এবার ৫০ শতাংশ আসন বিজেপি রাজ্যে পাবে। সেই কথা জোর গলায় দাবি করলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের এবার পতন হবে। তৃণমূলকে বাংলা থেকে উৎখাত করার ডাক দিয়েছেন শাহ। শুধু তাই নয়, বিজেপি বাংলায় সরকারে এলে ৪৫ দিনের মধ্যে রাজ্যের সীমান্তে কাঁটাতার বসানোর কাজ শেষ হবে। সেই কথাও জানিয়েছেন শাহ। বারাকপুরের আনন্দপুরীর মাঠে এদিন কর্মিসভা করেন অমিত শাহ। শুরু থেকেই তৃণমূল কংগ্রেস সরকারকে চড়া সুরে আক্রমণ করতে থাকেন তিনি। ক্রমে সেই সুর আরও তীব্র হয়। বাংলায় তৃণমূল ধারাবাহিকভাবে দুর্নীতি করছে। আরও একবার সেই অভিযোগ করেন তিনি। বাংলার ‘মা-মাটি-মানুষের’ সরকারের শাসনে, মায়েরা নিরাপদ নন। মাটিতে অনুপ্রবেশ ঘটছে, তারা জায়গা দখল করছে। অন্যদিকে মানুষজন সিন্ডিকেটের কবলে। এমনই কটাক্ষ করেছেন শাহ। বাংলার অনেক জায়গার সীমান্তে কাঁটাতার বসানোর জন্য রাজ্য সরকার জমি দিচ্ছে না। এদিন সেই অভিযোগও করলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বাংলার অনুপ্রবেশ ইস্যু গোটা দেশের কাছেই দুশ্চিন্তার। সেই কথাও তিনি জানিয়েছেন। এদিন শাহ বলেন, “লোকসভায় আমি বলেছিলাম ফেন্সিংয়ের জন্য রাজ্য সেই জায়গা দিচ্ছে না। এবার কলকাতা হাই কোর্ট ৩১ মার্চের আগে বিএসএফকে জমি দিতে বলেছে। তাও ওরা কোর্টের এই নির্দেশ মানবে না। এপ্রিলে বিজেপি রাজ্যে ক্ষমতায় এসে ৪৫ দিনে ফেন্সিং করে দেবে।” বাংলায় আগে দুটি আসনে জিতেছিল বিজেপি। ২০১৯ সালে একাধিক বিজেপি প্রার্থী ভোটে জিতে সাংসদ হন। গত বিধানভায় বিজেপির ৭৭ জন ভোটে জিতে বিধায়ক হয়েছিলেন। এবার বাংলায় বিজেপির ভোট ৩৮ থেকে ৪৫ শতাংশ হবে। শুধু তাই নয়, তিনি বিজেপি কর্মীদের টার্গেটও বেঁধে দিলেন তিনি। তাঁর কটাক্ষ, “তৃণমূল দুর্নীতিকে সংস্থা করেছে। সব সীমা ছাড়িয়ে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে। এই সরকার চলতে পারে না। ১০ লক্ষ কোটি টাকা মোদিজি বাংলায় দিয়েছে। এই টাকা কোথায় গেল? তৃণমূলের সিন্ডিকেট নিয়েছে, কাটমানি খেয়েছে।” বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘বন্দে মাতরম’ রচনা করেছিলেন। সেই রচনার এবার দেড়শো বছর। কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগে দেশজুড়ে বন্দে মাতরমের উদযাপন হচ্ছে। কিন্তু তৃণমূল সাংসদরা সংসদে এর বিরোধিতা করছেন। অনুপ্রবেশকারীদের খুশি করতেই তৃণমূল এমন করছে। কটাক্ষ করেছেন শাহ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তৃণমূল কংগ্রেস বাংলার অস্মিতাকে নষ্ট করছে। সেই খোঁচাও দিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।











